ইঞ্জিন সংকটের কারণে সিলেট রুটের পাঁচটি লোকাল ও ডেমু ট্রেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে সিলেট বিভাগের লাখো যাত্রীকে অতিরিক্ত ভাড়া, সময়ক্ষেপণ ও নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জানা যায়, একসময় সিলেট-ঢাকা, সিলেট-চট্টগ্রাম এবং সিলেট-আখাউড়া রুটে সুরমা, জালালাবাদ ও কুশিয়ারা নামে তিনটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রায় ছয় মাস আগে সিলেট-ঢাকা রুটের সুরমা ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে ২০২০ সালের দিকে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস এবং সিলেট-আখাউড়া রুটের কুশিয়ারা লোকাল ট্রেনও বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়া সিলেট-আখাউড়া রেলপথে চালু হওয়া এক জোড়া ডেমু ট্রেনও ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে ২০১৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, লোকাল ট্রেনগুলো চালু থাকাকালে স্বল্প খরচে যাতায়াতের সুযোগ ছিল। ছোট-বড় প্রায় সব স্টেশনেই ট্রেন থামত। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হতেন। বর্তমানে বিকল্প যানবাহনে যাতায়াত করতে গিয়ে যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও সময় নষ্ট হচ্ছে।

এদিকে লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক ছোট রেলস্টেশনের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা না থাকায় স্টেশনগুলো অনেকটা জনশূন্য হয়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও, ছকাপন, লংলা ও মনু রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দা দাইম উল্যা, বিলাল মিয়া, আসাদ আহমদ, শিপন খান, তারেক হাসান ও সাচ্চু মিয়া বলেন, “আমাদের স্টেশনগুলোতে আগে নিয়মিত লোকাল ট্রেন থামত। এখান থেকে শত শত মানুষ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে শ্রীমঙ্গলে যেতেন। অনেক যাত্রী কম খরচে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। স্টেশনগুলো সবসময় মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত। এখন সেই দৃশ্য শুধুই স্মৃতি। একের পর এক লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা চরম দুর্ভোগে আছি। অন্তত দুটি লোকাল ট্রেন দ্রুত চালুর দাবি জানাই।”

তারা আরও বলেন, “সিলেট রেলপথে ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলাচল খুবই অনিয়মিত। প্রায়ই কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও লাউয়াছড়া এলাকায় ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। অনেক সময় অন্য ট্রেনের ইঞ্জিন এনে বিকল ট্রেন চালু করতে হয়। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিলেট অঞ্চলের রেললাইন ও ট্রেনসেবার মান দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কুলাউড়া স্টেশনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নতুন ট্রেন চালু ও বন্ধ ট্রেন পুনরায় চালুর আশ্বাস দিলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

কুলাউড়া স্টেশনমাস্টার রোমান আহমেদ এবং শমশেরনগর স্টেশনমাস্টার রজত কুমার রায় বলেন, “ইঞ্জিন সংকটের কারণে লোকাল ট্রেনগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ট্রেনগুলো চালু হলে সিলেট অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হতো। পাশাপাশি টিকিট সংকটও অনেকটা কমে আসত।”

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, “বন্ধ ট্রেনগুলো পুনরায় চালুর জন্য নতুন ইঞ্জিন প্রয়োজন। ইঞ্জিন সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে বিদেশ থেকে ইঞ্জিন আনতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা দ্রুত নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি।”

সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত নতুন ইঞ্জিন সংযোজন এবং বন্ধ থাকা লোকাল ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা হলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে এবং রেলপথে যাতায়াত আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *