নতুন আতঙ্ক পলাতক আওয়ামী লীগে

দুর্নীতির মামলায় বিদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর ছড়াতেই বিদেশে আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও হত্যা মামলার আসামি এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশের প্রক্রিয়ায় থাকা নেতারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা বর্তমান আশ্রয়স্থল ছেড়ে আরও নিরাপদ কোনো দেশে আশ্রয়ের সন্ধান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে পলাতক আসামি বেনজীর আহমেদকে দুবাই সিটি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে আবুধাবি সরকার গত ১২ জুন (শুক্রবার) বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নিশ্চিত করে। গত রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। সরকারের তরফ থেকে সব ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন সাপেক্ষে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জানা গেছে, বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মানিলন্ডারিংসহ বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদকের ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে এবং বাকি পাঁচ মামলার তদন্ত চলমান। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে। তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে মাইলফলক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়; এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।”

নিষিদ্ধ আওয়ামী শিবিরে আতঙ্ক, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ

এদিকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে পালানো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে ভয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থান করা এবং বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে নাকচ হওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দলের যেসব নেতার নামে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও সাজা হয়েছে, তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও বিগত সরকারের সুবিধাভোগী, দুর্নীতিবাজ ও গুম-খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আমলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পলাতক সদস্যদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বর্তমানের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে ভারতে অবস্থানরতরা এখনো নিজেদের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করছেন। শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের ভারত সরকার যেভাবে আশ্রয় দিয়েছে, তাতে তারা মনে করছেন যে কোনো পরিস্থিতিতে মোদি সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে। তবে গত মে মাসের শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের আমলে সেখানে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ার পর সেই আশঙ্কার পারদও কিছুটা চড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, “সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার একটি নজির স্থাপন করেছে। বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের যেসব নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের জন্য এটি উদ্বেগজনক সংকেত। অনেক দেশ এখন অভিবাসন ও ভিসা প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার ও দুর্নীতির তথ্য যাচাই করছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরোয়ানা বা রেড নোটিশ ইস্যু করা সম্ভব হলে গ্রেপ্তার এড়ানো কঠিন হবে।”

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, “বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে, এই গ্রেপ্তারের মানেই তিনি দ্রুত ফিরে আসছেন— সেটা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এর জন্য একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশকে সন্তুষ্ট করতে হবে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে জোরদার যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম, কারণ ভারত সরকার তাকে অতিথি করে রেখেছে। কেবল ভারত সরকার চাইলেই তাকে ফেরত আনা সম্ভব।”

বেনজীরকে ফেরাতে নথিপত্র তৈরিতে তোড়জোড়

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও দুদকের পক্ষ থেকে নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এর আগে পি কে হালদার বা সন্ত্রাসী জিসান আহমেদকে আরব আমিরাত থেকে ফেরানো না গেলেও, নূর হোসেন বা মুসার মতো আসামিদের বিদেশ থেকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। তাই এখন সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। ঢাকার গুলশানের তার ৪টি ফ্ল্যাট ক্রোক করে আসবাবপত্রসহ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সাভানা রিসোর্টটি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

দুদকের আইনজীবী মো. মাহমুদুল আরেফিন স্বপন জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেটি মূলত দণ্ডিত বন্দিদের ক্ষেত্রে কার্যকর। যেহেতু বেনজীর এখনো দণ্ডিত নন এবং ইন্টারপোলের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাই ইন্টারপোলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে বসতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানিয়েছেন, ইন্টারপোলকে বিস্তারিত তথ্য জানাতে তারা দ্রুতই চিঠি পাঠাচ্ছেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৩৮
  • ১১:৫৬
  • ৪:৩২
  • ৬:৪৪
  • ৮:১০
  • ৫:০৪