নৌকা ছাড়াই সমুদ্রের তথ্য

শাবিপ্রবির অ্যাপে সংরক্ষিত হলো দেশের দুই সামুদ্রিক এলাকা

শাবিপ্রবির অ্যাপে সংরক্ষিত হলো দেশের দুই সামুদ্রিক এলাকা

একসময় সমুদ্রের গভীরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গবেষকদের নির্ভর করতে হতো নৌযাত্রার ওপর। সময়, অর্থ ও প্রতিকূল আবহাওয়া-সবকিছু পেরিয়ে নিতে হতো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের তথ্য। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। এখন নৌকায় না গিয়েও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে সমুদ্রের গভীর এলাকার নানা তথ্য।

এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সুব্রত সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার।

চট্টগ্রামের সলিমপুর-কাট্টলি ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র এলাকাকে ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা’ ঘোষণা করে গত ২ জুন গেজেট প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ দুই বছরের গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়।

 

অ্যাপের মাধ্যমে সমুদ্র গবেষণার নতুন দিগন্ত

এই গবেষণার অন্যতম হাতিয়ার ছিল ‘ন্যানো-ডোওপ সিফোরসিইএম’ (Nano-DOOP C4CEEM) নামের একটি মোবাইল অ্যাপ। অ্যাপটির উদ্ভাবক শাবিপ্রবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কাজী মঈনুল ইসলাম।

‘সিটিজেন ফর কোস্টাল ইকোসিস্টেম মনিটরিং (সিফোরসিইএম)’ পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা সাধারণ মানুষ, জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে সমুদ্রের তথ্য সংগ্রহ করেন। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি, অবস্থান, মাছের তথ্য, পানির বিভিন্ন উপাদানসহ নানা তথ্য গবেষণায় ব্যবহার করা হয়।

গবেষকরা জানান, অ্যাপের মাধ্যমে তোলা প্রতিটি ছবির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ যুক্ত হয়। ফলে কোন এলাকায় কোন প্রজাতির জীববৈচিত্র্য রয়েছে, তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

 

জেলেদের হাতেই গবেষণার তথ্য

এই গবেষণায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন উপকূলের জেলেরা। তাদের মোবাইলে অ্যাপটি যুক্ত করে দেওয়া হয়। তারা সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে মাছ, সামুদ্রিক জীব, পানির অবস্থা কিংবা পরিবেশের বিভিন্ন তথ্য ছবি তুলে পাঠান।

গবেষক দলের মতে, আগে একটি গবেষণা নৌযান নিয়ে সমুদ্রে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে প্রতিবার ৮০-৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। কিন্তু অ্যাপভিত্তিক এই পদ্ধতিতে সেই ব্যয় অনেক কমেছে।

ড. সুব্রত সরকার বলেন, “জেলেদের নৌকায় শুধু একটি ডিভাইস যুক্ত করে দিলেই তারা যেখানেই যান, সেখানকার তথ্য আমরা পেয়ে যাই। এতে গবেষণার খরচ কমে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।”

 

২০ হাজারের বেশি তথ্য, শনাক্ত চার শতাধিক প্রজাতি

২০২২ ও ২০২৩ সালে এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার ছবি-সম্বলিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে উপকূলীয় ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এলাকায় জুপ্লাঙ্কটন, সামুদ্রিক শৈবাল, সল্টমার্শ, সামুদ্রিক কাঁকড়াসহ চার শতাধিক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে।

গবেষণার মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপের চারপাশে প্রবাল, সি-কিউকাম্বার ও সামুদ্রিক শৈবালের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া গেছে।

 

গবেষণা থেকে সংরক্ষিত এলাকা

সরকার সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০-এর আওতায় কুয়াকাটা ও সলিমপুর এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে কুয়াকাটা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার আয়তন ৪ হাজার ২৪০ বর্গকিলোমিটার এবং সলিমপুর এলাকার আয়তন ১৮৫ বর্গকিলোমিটার।

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য এসব এলাকা সংরক্ষিত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে নতুন ধাপ

কুয়াকাটা ও সলিমপুরকে সংরক্ষিত ঘোষণার মাধ্যমে দেশে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে। এর ফলে আন্তর্জাতিক রিও কনভেনশনের আওতায় দেশের সমুদ্রসীমার ১০ শতাংশ সংরক্ষিত করার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।

ড. সুব্রত সরকার বলেন, “আমাদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের কোন কোন এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা যায় তা নির্ধারণ করা। দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে আমরা কুয়াকাটা ও সলিমপুর এলাকার সম্ভাবনা তুলে ধরেছি।”

প্রযুক্তি, গবেষণা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ-এই তিনের সমন্বয়ে শাবিপ্রবির এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, সমুদ্র গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৩৮
  • ১১:৫৭
  • ৪:৩৩
  • ৬:৪৫
  • ৮:১২
  • ৫:০৫