
১৯২৫ সালের দুর্নীতিগ্রস্ত ও উম্মত্ত বিশের দশকের ‘রোয়ারিং টুয়েন্টিস’ আমেরিকাকে দেখে কবি রবিনসন জেফার্স লিখেছিলেন, “জ্বলে ওঠো, ধ্বংসোম্মুখ প্রজাতন্ত্র”। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, আমেরিকা হয়তো “ব্যাপকভাবে সাম্রাজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।” মার্কিনীরা সেই নৈতিক পতন ও মর্যাদাহানি থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন, ঠিক একইভাবে বর্তমান সংকট থেকেও উত্তরণ ঘটাতে পারবেন বলে আশা করছেন। তবে তারা যখন রাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছেন, তখন জেফার্সের সেই দ্বিমুখী অনুভূতিই পথপ্রদর্শক হওয়া উচিত: একটি জাতি হিসেবে তাদের যেমন জৌলুস আছে, তেমনি তাদের অবক্ষয়ও ঘটছে।
এই ৪ জুলাই বা আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁরা যদি নিজেদের কাছে সৎ থাকেন, তাহলে স্বীকার করতেই হবে যে, যেসব মহান ও দৃঢ়চেতা মার্কিন নারী-পুরুষ এই বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তারা আজ দূর অতীতের এক ঐতিহাসিক স্মৃতিমাত্র। আজ মার্কিনীরা সেই ছন্নছাড়া দেশপ্রেমিকদের চেয়ে ১৭৭৬ সালের সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনেরই বেশি প্রতিরূপ হয়ে উঠেছেন, যারা কি না ওই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা যে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি আদর্শ প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন—তার বদলে মার্কিনীরা আজ এমন এক জাতিতে পরিণত হয়েছেন, যেখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান আকাশচুম্বী ও ভয়ানক।
২৫০ বছর বয়সে এসে আমেরিকা এখন এমন এক প্রৌঢ়ত্বের শেষ প্রান্তে উপনীত দেশ, যার পতনের স্পষ্ট লক্ষণগুলো একদম অনস্বীকার্য। যে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং রাজনীতিবিদদের বড় সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করার কোনো ক্ষমতাই যেন অবশিষ্ট নেই। শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়েছে, আর মার্কিন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলও ক্রমাগত নিম্নগামী। দেশটির সামাজিক সংহতি এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে যে, বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক-সামাজিক ইস্যুর তীব্র মতভেদে— অনেক মার্কিনীর কাছেই যুক্তরাষ্ট্রকে আর একক রাষ্ট্র মনে হয় না, বরং প্রায়শই মনে হয় আসলে দুটি ভিন্ন জাতি।
“দুর্নীতি কখনোই বাধ্যতামূলক ছিল না,” জেফার্স মিনতি করে বলেছিলেন। তবুও, কোনো না কোনোভাবে মার্কিনীরা এমন একজনকে দু-দুবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, যিনি নিজের রাজনৈতিক ও আর্থিক ফায়দা হাসিলের জন্য পরম উল্লাসে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তার এই মেকি প্রজাতন্ত্রের দীপ্তি নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যমান, তবে তা যেন কেবল ফায়ারপ্লেসের ওপরের তাক বা ম্যান্টেলপিসে ছড়িয়ে-ছিড়ে থাকা সোনার অলংকারের চাকচিক্য মাত্র। তার আদর্শ বীররা কর ও শুল্কের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া সেই বিপ্লবী দেশপ্রেমিকরা নন, বরং তার বীর হলো ‘গিল্ডেড এজ’ বা স্বর্ণখচিত যুগের ধনকুবেররা এবং তাদের রক্ষণশীল শুল্কনীতি। রাজা তৃতীয় জর্জের “অত্যাচার ও ক্ষমতা খর্ব” করার সেই রক্তাক্ত ইতিহাসকে যখন মার্কিনীরা একইসঙ্গে বর্জন ও স্মরণ করেন, ঠিক তখনই তিনি নিজেকে একজন রাজারূপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিত্রায়িত করেন।
এবং তা সত্ত্বেও, জেফার্স যেমনটা লিখেছিলেন, আমেরিকার এখনো “এক নশ্বর মহিমা” রয়ে গেছে। ওয়াশিংটনের নোংরা রাজনৈতিক পাঁক বা কাদার দলের বাইরে, সাধারণ মার্কিনিরা এখনো ঝুঁকি নিতে ও ব্যর্থ হতে ভয় পায় না; তারা জানে কীভাবে আছাড় খেয়ে পড়ে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। তাঁরা এমন এক শক্তিশালী ও পেশিবহুল জাতি, যা অদ্ভুতভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরও বেশি শক্তপোক্ত হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। তাঁরা এখনো বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, সেরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং সেরা সঙ্গীত রেকর্ড করেন। তাঁরা হয়তো ভয়াবহ সব নেতা নির্বাচন করতে পারেন, কিন্তু জনগণ নেতাদের চেয়েও দীর্ঘজীবী এবং এসব নেতাদের সহ্য করেও টিকে থাকেন।
ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত তাঁর এই নিবন্ধে ডেভিড ইগনাতিউস লিখেছেন, বিদেশ ভ্রমণ সাধারণত অনেক মার্কিনীকে আমেরিকার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। গত কয়েক দশক ধরে আমি যখনই বিদেশ থেকে সাংবাদিকতা করেছি, এটা স্পষ্ট ছিল যে আমেরিকার হাজারো নির্বোধ ভুল সত্ত্বেও—দেশটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রধান নোঙর বা ভরসাস্থল হিসেবে টিকে ছিল। আমরা এমন সব আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন জারি রেখেছিলাম, যা পুরো বিশ্বকে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করেছিল; আর আমাদের মিত্ররা যদি অনেক ক্ষেত্রে এর নিখরচায় সুবিধাবাদী অংশীদারও হয়ে থাকে, তবুও আমরা এমন এক জোয়ার তৈরি করতে পেরেছিলাম যা প্রায় সব তরীকেই ভাসিয়ে তুলেছিল।
তিনি বলেন, আমেরিকা এখনো বিশ্বকে মোহিত করে চলেছে, তবে এর মধ্যে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমি গত সপ্তাহটি থাইল্যান্ডে কাটিয়েছি; যে দেশটি একসময় সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঘূর্ণায়মান ছিল, সেটি এখন দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের মুখোমুখি—একদিকে পিছু হটতে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে উদীয়মান চীন। ব্যাংকক বিমানবন্দরে এখন চীনা পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়; আর মহাসড়কগুলোর পাশে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বিজ্ঞাপনে ভরা বিলবোর্ডের সারি যেন এক বিশাল প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে।
কনসাল্টিং ফার্ম ‘কার্নি’ আয়োজিত একটি সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আমি বারবার বিদেশি বিশ্লেষকদের মুখে শুনছিলাম যে, আমেরিকা কীভাবে দিন দিন একটি অনির্ভরযোগ্য এবং কখনো কখনো নিপীড়ক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেন, ভারত ও মালয়েশিয়া থেকে আসা বক্তারা একমত হয়েছেন যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। এর পরিবর্তে যা উদীয়মান হচ্ছে, তা হলো এক চরম মেরুকরণ ও বিভাজন—মধ্যপ্রাচ্যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে এবং খোদ ইউরোপে।
দেখা গেছে, সেখানে উপস্থিত বক্তাদের মধ্যে একমাত্র একজন চীনা বক্তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনেপ্রাণে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প সবার জন্যই এক ওলটপালটকারী বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী চরিত্র হতে পারেন, তবে চীনের জন্য তিনি এক দারুণ সুসংবাদ।” ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যেন ক্রমশ চীনের অনুকূলে এক বিন্দুতে এসে মিলছেন।
আমেরিকা হয়তো পিছু হটছে, কিন্তু বাকি বিশ্ব সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিচ্ছে। ট্রাম্প যখন একের পর এক নতুন শুল্ক আরোপ করছেন, অন্যান্য দেশগুলো তখন নতুন নতুন মুক্ত বাণিজ্য জোটে যোগ দিতে মরিয়া হয়ে ছুটছে। একজন বক্তা উল্লেখ করেছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির চেয়েও এখন বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি দ্রুত গতিতে ঘটছে। বিশ্বায়ন আসলে মরে যায়নি; বরং তা নিজেকে নতুন করে বিন্যস্ত করছে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো প্রধান সংযোগের প্লাগটি টেনে খুলে দিয়েছেন, কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ বা শক্তি এখনো সচল রয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ভবিষ্যৎ যেহেতু অনিশ্চিত, তাই করপোরেট কোম্পানিগুলো এখন বহুমুখী ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই তাদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
থাই নাগরিকরা আমাকে বলেছেন যে, তারা চীনের আধিপত্যবাদের অধীনে বাঁচতে চান না—সমগ্র এশিয়ার মানুষের মতোই তারাও চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ভয় পান। তবে তারা এখন আর আমেরিকাকেও বিশ্বাস করেন না। আমাদের আচরণ বড্ড বেশি খেয়ালি এবং স্বার্থপর। আমরা অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে সম্মান দাবি করি বটে, কিন্তু সেই সম্মান আমরা অর্জন করতে পারি না। এই দিনগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশ হলো জাপান—যারা আজ থেকে ৮০ বছর আগে ছিল এক নৃশংস সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। অথচ আজ জাপানিদের দেখা হচ্ছে নির্ভরযোগ্য ও ধৈর্যশীল হিসেবে। এই অনিশ্চিত পৃথিবীতে তারা অন্তত পূর্বানুমানযোগ্য।
আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাইয়ের আতশবাজিগুলো যথারীতি আকাশজুড়ে বিস্ফোরিত হবে ও আলো ছড়াবে (যদিও এর আগে রাষ্ট্রপতির দীর্ঘ ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ জ্বালাময়ী ভাষণ না থাকলেও আমার চলত)। এবারই প্রথম আমি আমার বাবাকে ছাড়া এই উৎসব উদযাপন করব, যিনি গত বছর ১০৫ বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে মারা গেছেন। প্রতি বছর তিনি ঘোষণা করতেন যে তিনি একটি “দেশপ্রেমমূলক ভাষণ” দিতে যাচ্ছেন এবং তারপরেই আমাদের রাস্তার নম্বর আর জিপ কোডটি সগর্বে উচ্চস্বরে আওড়াতেন। আমেরিকার এই গৌরবগাথা এখনো আমার চোখে পানি এনে দেয়, কারণ আমি একজন অতি-আবেগপ্রবণ মানুষ: একবার আমার এক সন্তান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তুমি কি সব সিনেমা দেখার সময়ই এভাবে কাঁদো?”
আমেরিকান হিসেবে আমাদের উত্থান ঘটে, পতন ঘটে এবং আমরা আবারও জেগে উঠি। জেফার্স নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন, এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা সবসময় উচ্চমার্গীয় কোনো কিছুর ওপর আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখি। তিনি লিখেছিলেন, “তবে আমার সন্তানদের জন্য আমি চাইব যে, তারা যেন ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকা এই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরত্ব বজায় রাখে… যখন শহরগুলো সেই দানবের পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়বে, তখনও পাহাড়গুলো অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।”
চরম সংকটের সময়েও ক্রমাগত উপরে আরোহণের এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে এই জাতির। ২৫০ বছর আগের আমাদের “স্বাধীনতার ঘোষণা” ছিল মূলত একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আদর্শের বহিঃপ্রকাশ। “সকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট” এবং “জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অন্বেষণ” মানুষের সার্বজনীন অধিকার—এই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করতে আমরা আজও প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছি। আমরা ভালো নেতা পেয়েছি, আবার ভয়াবহ রকমের খারাপ নেতাও পেয়েছি; কিন্তু প্রতি বছর, শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা স্মরণ করি যে এই গল্পের মূল চেতনা আসলে কী ছিল। আর আমরা ভাবি যে, কতখানি ভাগ্যবান হলে আজ অবধি এই আমেরিকান ইতিহাসের একটি অংশ হওয়া যায়।



