২০২৪ সালের ৪ আগস্ট— বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঘোষিত ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’র সেই ঐতিহাসিক দিন। কেন্দ্রঘোষিত এক দফা দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়লে তার চরম উত্তাপ এসে পড়ে সিলেটেও।

সেদিন সিলেটের গোলাপগঞ্জ পরিণত হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্রে; বিজিবি, পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী ক্যাডারদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে পুরো জনপদ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন আন্দোলনকারী ও সাধারণ জনতাসহ সাতজন, আহত হয়েছিলেন শতাধিক মানুষ। আজ দুই বছর (২০২৬) পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের স্বজনদের একটাই অভিযোগ— রক্তঝরা সেই দিনের আজও কোনো দৃশ্যমান বিচার হয়নি।

সেদিন দেশজুড়ে কারফিউ জারি থাকলেও ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গোলাপগঞ্জে প্রতিবাদ মিছিল বের করে ক্ষুব্ধ জনতা। সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ঢাকাদক্ষিণ সরকারি কলেজ ও বহুমুখী কলেজে জড়ো হতে থাকে। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

একপর্যায়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত বিজিবি ও পুলিশের টহল দলের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এতে ঘটনাস্থলে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং বিজিবির সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিজিবি প্রথমে রাবার বুলেট, পরে স্প্রিং বুলেট ও সরাসরি তাজা গুলি ছুড়তে শুরু করে।

গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের মাইকে এলাকাবাসীকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বারোকোট, ধারাবহর ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় ব্যারিকেড দিলে পুলিশ-বিজিবি দ্বিতীয় দফায় গুলি বর্ষণ করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নাজমুল ইসলাম, তাজউদ্দীন ও সানি আহমদ। গুরুতর আহত অবস্থায় জয় আহমদকে সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একসঙ্গে চারজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে একদিকে যেমন শোকের ছায়া নেমে আসে, অন্যদিকে পুরো গোলাপগঞ্জ উত্তাল হয়ে ওঠে প্রতিরোধে। আন্দোলনকারীরা শহীদ তাজউদ্দীনের মরদেহ জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে গোলাপগঞ্জ সদরের দিকে নিয়ে মিছিল শুরু করেন। একে একে বারোকোট, ধারাবহর ও রনকেলীসহ বিভিন্ন এলাকার জনতা রাস্তায় নেমে আসলে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা পিছু হটে উপজেলা পরিষদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে।

পরে শহীদদের লাশ নিয়ে ছাত্র-জনতা গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী এলাকায় অবস্থান নিলে সেখানে হাজার হাজার মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেন। একই সময় গোলাপগঞ্জ এমসি একাডেমি থেকেও আরেকটি বিশাল মিছিল চৌমুহনীর দিকে আসে। তবে অন্য পাশে অবস্থান নিতে শুরু করে আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনী।

আন্দোলনকারীরা গোলাপগঞ্জ মডেল থানা ঘেরাও করলে পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী ক্যাডাররা একযোগে পুনরায় টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান গৌছ উদ্দীন ও মিনহাজ উদ্দিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্যাডারদের টানা তাণ্ডবে সেদিন গোলাপগঞ্জের রাজপথ ভিজেছিল রক্তে; চারদিকে ছিল শুধুই লাশের মিছিল, স্বজন হারানোর কান্না আর প্রতিবাদের গর্জন।

৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যারা শহীদ হয়েছিলেন: ১. নাজমুল ইসলাম (পিতা: তৈয়ব আলী, গ্রাম: নিশ্চিন্ত) ২. সানি আহমদ (পিতা: কয়ছর আহমদ, গ্রাম: শিলঘাট) ৩. তাজউদ্দীন (পিতা: মকবুল আলী, গ্রাম: বারোকোট) ৪. মিনহাজ উদ্দিন (পিতা: আলাই মিয়া, গ্রাম: দত্তরাইল) ৫. গৌছ উদ্দীন (পিতা: মোবারক আলী, গ্রাম: ঘোষণা) ৬. জয় আহমদ (পিতা: ছুরাই মিয়া, গ্রাম: রায়গড়)।

এছাড়া সিলেট শহরের কোতোয়ালি থানার সামনে ক্বিন ব্রিজ এলাকায় একই দিন পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে পরদিন (৫ আগস্ট) চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান গোলাপগঞ্জের কানিশাইল গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে কামরুল ইসলাম পাভেল। এই নিয়ে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে গোলাপগঞ্জের মোট সাতজন বীর সন্তান প্রাণ বিসর্জন দেন।

দুই বছর পার হয়ে গেলেও শহীদদের পরিবারে আজও থামেনি কান্না। তাদের চাওয়া একটাই— অন্তত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখে যাওয়া।

শহীদ হাফেজ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার ছেলেটা খুবই নিরীহ ছিল, একজন হাফেজে কোরআন ছিল। ছেলের কথা মনে পড়লে এখনো চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। মামলা করেছি, কিন্তু বিচার এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। শুনেছি অনেক আসামি নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছে। আমি শুধু আমার নিষ্পাপ ছেলের প্রকৃত হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি চাই।”

শহীদ নাজমুল ইসলামের ভাই ছামিদ আহমেদ বলেন, “ভাই হারানোর ক্ষত আজও আমাদের শুকাতে দেয়নি। পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের লোকজন আমার ভাইকে প্রকাশ্যে গুলি করে মেরেছে। কিন্তু পরিবারের মতামত না নিয়ে ভাবিকে দিয়ে প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করানো হয়েছে। আমরা কোনো রাজনীতি চাই না, ভাইয়ের প্রকৃত খুনিদের ফাঁসি চাই।”

মামলার বিচারিক অগ্রগতি ও সার্বিক বিষয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. জাবের সাদেক জানান, “ঘটনাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট অগ্রগতি রয়েছে। তবে মামলায় আসামির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তথ্য-প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছাড়াও বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। তদন্ত সম্পন্ন করে অতি দ্রুত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে ঘাতকদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন পুরো গোলাপগঞ্জবাসীর প্রধান দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *