সিলেট নগরের জল্লারপাড়ে মাত্র তিন ফুট রাস্তা সম্বলিত স্থানে সিটি করপোরেশনের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ, প্রতিবেশীর আলো-বাতাসের অধিকার ক্ষুণ্ন, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রজি উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) নগরীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন জল্লারপারের বাসিন্দা ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী কয়সর রহমান ।
লিখিত বক্তব্যে কয়সর রহমান বলেন, তাঁর বাসার পাশের ১৮ নম্বর বাসায় বসবাস করেন সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রজি উদ্দিন খান এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ইসমাইল খান, পিংকু খান, পারভেজ খান ও পারভীন খান। নিজের প্রভাব খাটিয়ে মো. রজি উদ্দিন খান সিটি করপোরেশনের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও সেফটি গ্যাপের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে কোনো অনুমোদিত নকশা ছাড়াই মাত্র তিন ফুট রাস্তা সম্বলিত স্থানে ভবনের পঞ্চম তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, ভবনটি নির্মাণের সময় বাধ্যতামূলক সেফটি গ্যাপ রাখা হয়নি। ফলে ভবনটি তাঁর বাড়ির গা-ঘেঁষে নির্মিত হওয়ায় দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ভোগ করে আসা আলো-বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে তাঁর পরিবার বঞ্চিত হচ্ছে। ১৮৮২ সালের সুবিধা অধিকার আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী এই অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কয়সর রহমান আরও অভিযোগ করেন, ভবনটিতে কোনো ফায়ার এক্সিট কিংবা প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো জল্লারপাড় এলাকার বাসিন্দারা বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, মাস্টাররোল থেকে সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়া মো. রজি উদ্দিন খান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় তিনি নিজের সরকারি কার্যালয়কে কার্যত দলীয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন।
লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঠিকাদারদের বিল আটকে রেখে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করতেন। ঘুষের বিনিময়ে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন নকশাবহির্ভূত ও অবৈধ ভবনের অনুমোদন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে জল্লারপাড়ের ৩ নম্বর বাসা, লাল মিয়া কলোনির একাধিক ভবন এবং হাউজিং এস্টেট এলাকার এক আইনজীবীর বাড়ির নাম উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, মো. রজি উদ্দিন খান নিজের, স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে একাধিক গাড়ি, জমি ও বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গোয়াবাড়ী এলাকায় প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল বাংলো নির্মাণ করেছেন তিনি। অনুসন্ধান এড়াতে ওই বাড়িতে কোনো নামফলকও ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয় এবং আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে তিনটি জীবনবিমা স্কিম চালুর অভিযোগও করা হয়। কয়সর রহমান আরও অভিযোগ করেন, দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োজিত মাস্টাররোল শ্রমিকের সংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়িয়ে দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিনি জানান, অবৈধ ভবন অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত বছরের ২০ নভেম্বর সিসিকে লিখিত আবেদন করা হয়। কর্তৃপক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে সিনিয়র সিভিল জজ আদালত, সদর সিলেটে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করা হয়।
এছাড়া ৩০ জুন মো. রজি উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কয়সর রহমান জল্লারপারের ১৮ নম্বর বাসার নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ পঞ্চম তলার অবৈধ অংশ অপসারণ, সিসিকের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অবৈধ অনুমোদনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগের সত্যতা মিললে মো. রজি উদ্দিন খানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে তাঁর সকল সম্পদের দুদকের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানান।
আমারসিলেট/হা



