প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ও ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় বিএনপির দুটি বলয়। তীব্র উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শনিবার (৮ আগস্ট) মিছিল, পাল্টা মিছিল ও পথসভার মধ্য দিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে পুরো দিরাই শহর। সমাবেশ থেকে প্রবীণ বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দলীয় ‘সিন্ডিকেট’ ও কথিত ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্ত করার দীপ্ত শপথ নিয়েছেন তাঁর অনুসারীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৬ আগস্ট দিরাই থানা পয়েন্টে সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর উপস্থিতিতে তাঁর অনুসারীরা একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। এর জবাবে আজ একই স্থানে ‘আগস্ট বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে পাল্টা সমাবেশের ঘোষণা দেয় তাঁরই ছোট ভাই ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বাধীন বলয়। শুক্রবার রাতে এই ঘোষণার বিরুদ্ধে অপর পক্ষের বিক্ষোভের পর থেকেই পুরো এলাকায় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দিরাই থানা পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দিরাই থানা পয়েন্ট, স্থানীয় বাজার, কলেজ রোড ও বাগানবাড়ি এলাকাজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। তবে পুলিশের কড়া নজরদারি ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করেই বেলা ১১টার পর থেকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিছিল বের করে দুই পক্ষের উত্তেজিত নেতাকর্মীরা।
পরবর্তীতে শহরের বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টারে মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক সমর্থিত অংশটি এক প্রতিবাদী সমাবেশ সম্পন্ন করে। উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরীর পরিচালনায় সমাবেশে জেলা ও স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের পূর্বনির্ধারিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পণ্ড করার উদ্দেশ্যেই আকস্মিকভাবে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ও ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল।” প্রবীণ নেতা নাছির চৌধুরীর বর্তমান অবস্থান তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অতীতের ফ্যাসিবাদের আশীর্বাদপুষ্ট বর্তমান আহ্বায়ক আমির আলী ও তার চারপাশের একটি সুবিধাভোগী চক্র তাঁকে একপ্রকার বন্দিদশায় আটকে রেখেছে। এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের হাত এবং কথিত ‘আয়নাঘর’ থেকে প্রবীণ এই নেতাকে মুক্ত করে পুনরায় গণমানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন— বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, জেলা বিএনপির সদস্য অশোক রায়, যুগ্ম আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রতি রঞ্জন দাস, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল করিম চৌধুরী, সদস্য শোয়েব হাসান, অ্যাডভোকেট ওবায়দুর চৌধুরী মিশু, সুমন মিয়া, জাকারিয়া আহমেদ এবং সাবেক ছাত্রনেতা আবুল হাসনাত রিপন।
সংগঠনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন— পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন মিলাদ, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েল তালুকদার, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু হাসান চৌধুরী সাজু, সদস্য সচিব তানভীর চৌধুরী, ‘জুলাই যোদ্ধা’ মাহমুদুল হাসান সাগর এবং উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক সৈদুর রহমান তালুকদার সহ সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার জানান, জনস্বার্থ ও সার্বিক নিরাপত্তার খাতিরেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় উভয় পক্ষের মিছিল ও সমাবেশ কোনো সংঘাত ছাড়াই শেষ হয়েছে এবং শহরের পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত ও প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।



