মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য।
একসময় যেখানে গভীর বনের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল অজগরের বিচরণ, এখন সেই বিশালাকৃতির সাপ নিয়মিত দেখা যাচ্ছে মানুষের বাড়ির আঙিনা, হাঁস-মুরগির খামার, বাঁশঝাড়, চা-বাগান, এমনকি হাইল হাওড়ের আশপাশেও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ অজগরের এমন ঘন ঘন উপস্থিতি শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্কের পেছনে দায়ী মূলত বন ধ্বংস, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো মানবসৃষ্ট কারণ।
বনের বাসিন্দারা বাধ্য হয়েই আশ্রয় ও খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।দুই মাসেই উদ্ধার ১০ অজগরবাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন ও জুলাই—এই দুই মাসেই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ থেকে ১৮ ফুট এবং ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত।তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি, ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে পৃথকভাবে দুটি, ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া এলাকা থেকে একটি এবং ২৮ জুলাই কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান ও শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
প্রতিটি ঘটনার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে পুনরায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।ভেঙে পড়ছে বনের খাদ্যশৃঙ্খলক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা বলেন, একসময় বনের হরিণ বা ছোট ছোট বন্যপ্রাণী লোকালয়ের আশপাশে দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে।
হরিণের দেখা মেলাই কঠিন, অথচ প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে বিশাল অজগর।তিনি বলেন, “বনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। অজগর এখন খামারের হাঁস-মুরগি কিংবা গৃহপালিত প্রাণী সহজ শিকার হিসেবে পাচ্ছে। ফলে গ্রামবাসী সবসময় আতঙ্কে থাকেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, বন উজাড়, ফলদ গাছ কমে যাওয়া এবং গাছের কোটর ও ছড়ার পাশের প্রাকৃতিক গর্ত নষ্ট হওয়ার কারণে অজগরের নিরাপদ আবাসস্থল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।পরিবেশগত ভারসাম্য হারাচ্ছে বনসিলেট বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর একটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও বিরল বন্যপ্রাণীর কারণে এটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ পর্যটক শ্রীমঙ্গল হয়ে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়ায় প্রবেশ করেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে বনটির আয়তন ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখল, অবৈধ জনবসতি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগান সম্প্রসারণ এবং মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের কারণে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের ওপর।সড়ক ও রেলপথও বাড়াচ্ছে ঝুঁকিলাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়েই শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার সংযোগ সড়ক চলে গেছে। একইভাবে ঢাকা–সিলেট–চট্টগ্রাম রেললাইনও বনাঞ্চল অতিক্রম করেছে।বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ভাষ্য, বনভূমির দুই পাশে বিচরণ করতে গিয়ে প্রায়ই প্রাণীগুলো সড়ক ও রেললাইন পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়।
বিভিন্ন সময়ে ট্রেন কিংবা যানবাহনের ধাক্কায় সাপ, গন্ধগোকুল, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে বনের জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়ছে।কেন লোকালয়ে আসছে বন্যপ্রাণী?শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ পাহাড়, টিলা, বনাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চা-বাগানবেষ্টিত এলাকা। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বন দীর্ঘদিন ধরে অজগর, বানর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।তবে বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা, জনবসতি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগানের বিস্তারের কারণে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা লোকালয়, চা-বাগান এবং সড়কের কাছাকাছি চলে আসছে।লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীগুলোর একটি অংশ মানুষের হাতে মারা পড়ে। আবার সচেতন মানুষ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংগঠনকে খবর দিলে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করে।বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাবন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, অজগরের প্রধান খাদ্য ইঁদুর, পাখি, বনমোরগ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকটে পড়ে অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।
একই সঙ্গে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় তাদের বিকল্প আশ্রয়ও কমে গেছে।তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়লেও এটি শুধু উদ্ধার অভিযানের সফলতা নয়; বরং বনাঞ্চলের ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং পরিবেশগত সংকটেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত।বন বিভাগের বক্তব্যবন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। চা-বাগানও তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের একটি জায়গা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও অজগর দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।চলতি বছরের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের বনাঞ্চল পরিদর্শন করে বনভূমি দখল করে অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা এবং বন উজাড়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।সংকটের মূল সমাধান কোথায়?দুই মাসে ১০টি অজগর উদ্ধারের ঘটনা শুধু কয়েকটি উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যান নয়, এটি লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের পরিবেশগত বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না।
বনভূমি দখল বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়বে, আর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।



