“বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা” : এক নান্দনিক ভ্রমণকাহিনির কিছুকথা

“বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা” : এক নান্দনিক ভ্রমণকাহিনির কিছুকথা

আবু সালেহ আহমদ: বর্তমানে কয়েক মাস ধরে স্বস্ত্রীক কানাডা ভ্রমণে রয়েছেন বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা দেওয়ান মাসুদুর রহমান চৌধুরী। এর আগেও তিনি ২০২৩ সালে কানাডা ভ্রমণ করেছিলেন। সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতির নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন একটি নান্দনিক ও মননশীল ভ্রমণগ্রন্থ—‘বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা’। সৌভাগ্যের বিষয়, গ্রন্থটির ভূমিকা লেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময় গ্রন্থটির ভূমিকার শুরুতেই লিখেছিলাম—

«“বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা” মূলত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে রচিত একটি নান্দনিক ভ্রমণকাহিনি। বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনির কদর ও আবেদন বরাবরই স্বতন্ত্র। শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে পাঠক ভ্রমণসাহিত্যের মধ্য দিয়ে অচেনা দেশ, জনপদ, প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য আনন্দ লাভ করেন। আর সেই ভ্রমণবৃত্তান্তের সঙ্গে যখন কোনো দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার অন্তর্লীন চিত্র যুক্ত হয়, তখন তার আবেদন নিছক ভ্রমণবর্ণনার সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার এক মূল্যবান দলিল।

‘বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা’ ঠিক তেমনই একটি গ্রন্থ। লেখক অত্যন্ত যত্ন, মমতা ও অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে কানাডার বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে যেমন রয়েছে ভ্রমণপিপাসুর বিস্ময়, তেমনি রয়েছে একজন সচেতন লেখকের অনুসন্ধানী মন। ইতিহাসের নানা উপাদান, ঐতিহ্যের বিচিত্র অনুষঙ্গ এবং প্রবাসজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে তিনি সুনিপুণভাবে গ্রন্থের পরতে পরতে সংযোজন করেছেন। বিশেষত বাঙালি কমিউনিটির জন্য গ্রন্থটি হয়ে উঠতে পারে একটি মূল্যবান স্মারক ও প্রামাণ্য দলিল। লেখকের এই সার্থক প্রয়াস আমাদের দেশ ও কানাডার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিতে জানতে এবং তার পথে আরও গভীরভাবে হাঁটতে অনুপ্রাণিত করবে—এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

নির্মোহ, নিরহংকার ও ভ্রমণপিপাসু এই লেখক একই সঙ্গে চিন্তাশীল, সমাজসচেতন ও সংস্কৃতিমনস্ক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে কেবল একজন ভ্রমণলেখক হিসেবে নয়, বরং একজন অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও সমাজ-ভাবুক হিসেবেও স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন একাধিকবার। সুইডেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে রচনা করেছেন মননশীল গ্রন্থ ‘স্টকহোম ক’দিন’। সেই ধারাবাহিকতায় কানাডা ভ্রমণকে কেন্দ্র করে তাঁর শ্রম, সাধনা, পর্যবেক্ষণ ও সৃজনশীলতার যে সমন্বয় ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

বহু সংস্কৃতির দেশ কানাডা’-তে তিনি শুধু পর্যটকের চোখে কানাডাকে দেখেননি; বরং একজন ইতিহাসসচেতন ও সমাজমনস্ক লেখকের দৃষ্টিতে দেশটিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। কানাডার স্বাধীনতা, নামকরণ, জাতীয় পতাকা, ভাষাবৈচিত্র্য, অর্থনীতি, নদ-নদী, সাহিত্য, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও অবস্থান, পর্যটনকেন্দ্র, বিনোদন পার্ক, ঐতিহাসিক মসজিদ ও গির্জা, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, বেগমপাড়া, প্রবাসী বাঙালিদের জীবন ও উৎসব, নারীর মর্যাদা, শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও করণীয়—এমন বহুবিধ বিষয় তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থটির প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে কানাডার প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানকার সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন সম্পর্কে পাঠকের ধারণা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও এসব লেখা হতে পারে আত্মপ্রত্যয়, জ্ঞানার্জন ও বিশ্বদৃষ্টির এক অনুপ্রেরণামূলক পাঠ। দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম এই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে নতুন চিন্তার খোরাক পাবে—এ প্রত্যাশা অমূলক নয়।
আমার আরও একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস আছে—দুই দেশে অবস্থানরত তাঁর নাতি-নাতনিরা একদিন যখন এই ভ্রমণকাহিনিগুলো পড়বে, কিংবা ভবিষ্যতে এগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করবে, তখন তারা তাঁদের প্রিয় দাদার সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিঃসন্দেহে গর্ব অনুভব করবে। একজন লেখকের সৃষ্টিকর্ম যখন প্রজন্মের সীমানা অতিক্রম করে উত্তরসূরিদের কাছেও মূল্যবান হয়ে ওঠে, তখনই তার সৃষ্টির প্রকৃত সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখককে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁকে আমি একজন আদর্শিক, ধীরস্থির, শান্ত, অবিচল, নির্মোহ ও নিরহংকার মানুষ হিসেবেই জেনেছি। তাঁর ব্যক্তিত্বে নেই আত্মপ্রচারের কোনো উচ্ছ্বাস; বরং রয়েছে নীরবে কাজ করে যাওয়ার এক দৃঢ় প্রত্যয়। প্রায় নয়টি গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি ইতোমধ্যে আঞ্চলিক ও জাতীয় সাহিত্যের পাঠকদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাদের এক পরিসর সৃষ্টি করেছেন।

শুধু সাহিত্যচর্চাতেই তাঁর অবদান সীমাবদ্ধ নয়। নিজ এলাকায় তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ‘জনপ্রবাদ’ অনিয়মিত সাহিত্য ত্রৈমাসিক এবং ইউএসএ বাংলা আন্তর্জাতিক সাহিত্য ফোরাম-এর উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রেখে চলেছেন। পাশাপাশি তরফ সাহিত্য পরিষদ, কুরশা-খাগাউড়া সাহিত্য পরিষদ এবং বানিয়াচং সাহিত্য সংসদ-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে স্থানীয় সাহিত্যচর্চার উৎকর্ষ সাধনেও তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
দেওয়ান মাসুদুর রহমান চৌধুরীর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি ভ্রমণকে কেবল স্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখেন না; বরং ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে খোঁজেন, ঐতিহ্যকে আবিষ্কার করেন, মানুষকে বোঝেন এবং সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেন। তাঁর লেখায় তাই পথের সঙ্গে মিশে যায় ইতিহাস, দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় দর্শন, আর ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনবোধ।

আজ তিনি আবারও স্বস্ত্রীক কানাডার পথে। নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন দৃশ্য, নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতির সান্নিধ্যে তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন নিশ্চয়ই আরও কিছু মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এবারের ভ্রমণও তাঁর সৃজনশীল মননে নতুন কোনো গ্রন্থের জন্ম দেবে—যে গ্রন্থে ধরা পড়বে কানাডার আরও কিছু অদেখা রূপ, অনালোচিত ইতিহাস এবং মানুষের জীবন-সংস্কৃতির আরও কিছু অনুপম অনুষঙ্গ।
তাঁর এই দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা আরও সমৃদ্ধ হোক, তাঁর কলম আরও দীপ্ত হোক, আর দেশ-বিদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্বেষণে তাঁর এই নিরলস অভিযাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠুক এক মূল্যবান আলোকবর্তিকা—এই শুভকামনা রইল।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:১৮
  • ১১:৫৬
  • ৪:২৩
  • ৬:১৪
  • ৭:২৯
  • ৫:৩৩