মরমী সাহিত্য ও সঙ্গীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর। তিনি বলেছেন, মরমী সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর প্রাণের সম্পর্ক রয়েছে। সিলেটের মরমী সাধক ও কবিদের সৃষ্টিকর্ম এ অঞ্চলের মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ঐতিহ্যকে অবহেলা না করে গবেষণা, চর্চা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
২৮ আগস্ট, শুক্রবার সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ কাজী নজরুল অডিটরিয়ামে জকিগঞ্জ সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে মরমী কবি ফকির মুজাহিদকে সংবর্ধনা ও মরমী সঙ্গীত সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী ও মরমী সঙ্গীতপ্রেমীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
কবি ফজলুর রহমান ফজলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর। মূল আলোচক ছিলেন অধ্যক্ষ ড. হাসমত উল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আতিয়ার রহমান ও মোঃ আব্দুল মতিন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সুধীজনরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম আতাউর রহমান পীর বলেন, “মরমী সঙ্গীতের সঙ্গে আমার প্রাণের সম্পর্ক রয়েছে।” তিনি বলেন, তাঁর পরিবারও মরমী সাধনা ও সাহিত্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রপিতামহ শাহ আছদ আলী পীর ছিলেন একজন কামেল পীর ও মরমী সাধক। তিনি মরমী ভাবধারায় রচনা করেছেন ‘সহর চরিত’ ও ‘এবাদতে মগজ’ নামে দুটি গ্রন্থ। গ্রন্থ দুটি ১২৮৫ বঙ্গাব্দে সিলেটি নাগরী লিপিতে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিলেটি ভাষা ও নাগরী লিপির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে এম আতাউর রহমান পীর বলেন, সিলেটের ভাষা ও সাহিত্যকে কেবল আঞ্চলিকতার সীমায় বিচার করলে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক ব্যাপ্তি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই ভাষার রয়েছে নিজস্ব সাহিত্যভাণ্ডার, পুঁথি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহম্মদ আছদ্দর আলী সিলেটি নাগরী লিপিতে প্রকাশিত ১৪৭টি পুঁথির উল্লেখ করেছেন—যা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাহিত্য-ঐতিহ্যেরই প্রমাণ।
সিলেটি ভাষা নিয়ে যারা নেতিবাচক মন্তব্য বা সমালোচনা করেন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সমালোচনার আগে গবেষণা প্রয়োজন। সিলেটি ভাষার ইতিহাস, ব্যাকরণ, সাহিত্য, পুঁথি ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করলে এর স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তিনি সিলেটি ভাষা ও এর সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন এবং গবেষক ও তরুণ প্রজন্মকে এ বিষয়ে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
মরমী কবি ফকির মুজাহিদের সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করে প্রধান অতিথি বলেন, মরমী কবিদের সৃষ্টিতে শুধু গান বা কাব্যের সৌন্দর্য নেই; এর মধ্যে মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, মানবপ্রেম, জীবনবোধ ও আধ্যাত্মিকতার গভীর প্রকাশ ঘটে। মরমী কবিদের লেখনী মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে ভূমিকা রাখে। ফকির মসউদের সৃষ্টিকর্ম এই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মূল আলোচক অধ্যক্ষ ড. হাসমত উল্লাহ বলেন, সিলেটের মরমী সাহিত্য ও সঙ্গীত বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য নিয়মিত সাহিত্যসভা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি ফকির মুজাহিদের সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাঁর অবদানের প্রশংসা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে কবি ফজলুর রহমান ফজলু বলেন, মরমী সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। এই ধারার কবি ও সাধকদের সৃষ্টি সংরক্ষণ করা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। তিনি জকিগঞ্জ সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও মরমী কবি ফকির মুজাহিদের লেখনী ও সৃষ্টিকর্মের প্রশংসা করেন। তাঁরা বলেন, আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও মরমী সাহিত্য ও সঙ্গীত মানুষের আত্মিক প্রশান্তি ও মানবিক চেতনার অনন্য উৎস হয়ে আছে।
আলোচনা সভার পর শুরু হয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পীরা একে একে মরমী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁদের কণ্ঠে মরমী সুরে মুখর হয়ে ওঠে কাজী নজরুল অডিটরিয়াম। শিল্পীদের পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে সঙ্গীত উপভোগ করেন।
সংবর্ধনা ও সঙ্গীত সন্ধ্যার মধ্য দিয়ে জকিগঞ্জ সাহিত্য সংসদের এ আয়োজন শুধু একজন মরমী কবিকে সম্মান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সিলেটের মরমী সাহিত্য, সঙ্গীত, ভাষা ও নাগরী লিপির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রয়াস হিসেবে পরিগণিত হয়।
9:09 AM



