সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতাল যেন এখন রোগীর চাপে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী। ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে শিশু ওয়ার্ডে। জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালের শয্যা তো দূরের কথা, মেঝেতেও জায়গা মিলছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে শিশু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একদিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯১৬ জন ছাড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জনই ছিল শিশু। বর্তমানে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৩০০-এর বেশি শিশু রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে হাম সন্দেহে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও শতাধিক।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শয্যা না পেয়ে রোগী ও স্বজনরা মেঝেতে গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন। কোথাও রোগীর স্বজনদের মেঝেতে বসে থাকতে দেখা গেছে, আবার কোথাও একই শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। শিশু ওয়ার্ডে পরিস্থিতি আরও নাজুক। শয্যার অভাবে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশু রোগীর পাশাপাশি জ্বর, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। হাম সন্দেহে শিশু রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপের পাশাপাশি চিকিৎসক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৪৯ জন মেডিকেল অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসকের পদোন্নতি হওয়ায় তারা সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বদলি হয়েছেন। ফলে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসককেই ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীকে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।
শান্তিগঞ্জের পাগলা এলাকার আঞ্জব আলী বলেন, ‘কয়েক দিন নিচের তলায় ছিলাম। হাম সন্দেহে আমার ছেলেকে এখন উপরে পাঠিয়েছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। জায়গা নেই, ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না।’
শিশু ফাতেমা জান্নান রাবিয়ার নানী জহুরা খাতুন বলেন, ‘গত চারদিন ধরে হাসপাতালে ছিলাম। রোগীর চাপ খুব বেশি। চার দিনের মধ্যে মাত্র একদিন খাবার পেয়েছি। ডাক্তারের দেখা পেয়েছি মাত্র একদিন।’
হাসপাতালের বাবুর্চি মজনু মিয়া বলেন, ‘২৫০ জন রোগীর খাবার এখন ৯০০-এর বেশি রোগীকে দিতে হচ্ছে। এক টুকরো মাছকে তিন টুকরো করে দিতে হচ্ছে। একজনের ভাত তিনজনকে ভাগ করে দিয়েও কুলাতে পারছি না।’
এদিকে হাসপাতালের এমন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক শহিদ নুর আহমদ বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী লাইফসাপোর্ট থেকে আমাদের বাঁচান। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে এসে দেখে যান বাস্তবচিত্র। এখানে ২৫০ শয্যার স্থলে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী ভর্তি থাকে। সিট না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে পড়ে রয়েছে। ওষুধ নেই, খাবার নেই। কয়েকজন ডাক্তার দিয়ে হাসপাতালকে লাইফসাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। তিনগুণ রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।’
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহমদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা আছে ২৫০ জন রোগীকে সেবা দেওয়ার। অথচ প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০-এর বেশি ভর্তি হওয়া রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি।’ চিকিৎসক সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘৪৯ জন মেডিকেল অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও আছেন মাত্র ১২ জন। ২৫০ জনের খাবার যদি ৯০০ জনকে খাওয়ানো হয়, তাহলে খাবারে ভাগ কম পড়াটাই স্বাভাবিক।



