‘এই কলা, এই কলা, কলা লাগবেনি কলা’, ফেরিওয়ালার এমন হাঁক ডাকে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আখাউড়া জংশনে ট্রেন যাত্রীদের। ঢাকাগামী কিংবা সিলেটগামী যাত্রীরা এই ঐতিহ্যবাহী কলার সাথে পরিচিত। সাগর কলা। সুগন্ধময়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এই কলা সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। আকারে বেশ লম্বা ও বড়ো কলা। আগেকার দিনে সিলেটের কোন হাট বাজারে এই সাগর কলা পাওয়া যেতো না। তাই ট্রেনে বাসা বাড়ি বা কর্মস্থলে ফেরার সময় বেশির ভাগ ট্রেনযাত্রী এক বা দুই কাঁদি( কান্দা) সাগর কলা নিয়ে আসতেন। শৈশবে দেখেছি, পরিবারের কেউ ঢাকা থেকে ফিরে এলে খোঁজ করতাম, সাগর কলা এনেছেন কি না। আমাদের কাছে এতো লোভনীয়, পছন্দের ছিলো এটা। সেই নস্টালজিক সাগর কলায় এখন সিলেট নগরীর বাজার সয়লাব। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই কলা কি সেই সুগন্ধময়, সুস্বাদু সাগর কলা? না, মোটেও নয়। এগুলো হাইব্রিড জাতের সাগর কলা। নামেই সাগর, কামে না।
বাজারের সাগর কলা আর আখাউড়া ট্রেনের সাগর কলা দুই জিনিস। ট্রেনেরগুলো হলো আসল সাগর কলা। গাছে একদম পেকে, টুপটুপ করে পড়ার আগ মুহূর্তে কাটে। গাছেই মিষ্টি হয়।
কলা কাটার পর ২-৩ দিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। কোনো কেমিক্যাল লাগে না। ভেতরে আঠা আঠা, ঘ্রাণ থাকে। এখন বাজারে সয়লাব কলার
বেশিরভাগই হাইব্রিড সাগর কলা। গাছ থেকে কাঁচা অবস্থায় কেটে ফেলে। তারপর কার্বাইড বা ইথিলিন গ্যাস দিয়ে ১ রাতে পাকায়। বাইরে হলুদ, ভেতরে শক্ত, পানসে। ঘ্রাণ নাই। ৭-৮ দিন কোল্ড স্টোরেজে থাকে, ট্রাকে আসে। ঠান্ডায় কলার মিষ্টি হওয়ার যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া (স্টার্চ থেকে সুগার), সেটা নষ্ট হয়ে যায়।
ট্রেনের আসল সাগর কলা মূলত নরসিংদী জেলা থেকে আসে। বাংলাদেশের নরসিংদী জেলা সুস্বাদু সাগর কলার জন্য সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। এর মধ্যে ‘অমৃত সাগর’ জাতের কলা অত্যন্ত সুমিষ্ট ও সুগন্ধযুক্ত।
আর এখন বেশিরভাগ সাগর কলা আসে যশোর, বগুড়াসহ অন্যান্য স্থান থেকে — চাষের কলা। স্বাদ কম, মিষ্টি কম। কিছুটা পানসে।
আসল সাগর পাকা কলার গায়ে কালো ছিটা ছিটা দাগ থাকবে, বোঁটা একটু কালচে থাকবে, আর কলা ধরলেই নরম লাগবে, ঘ্রাণ বের হবে। আর দাম? হাইব্রিড সাগর কলা আসল পোক্ত সুস্বাদু কলার তুলনায় অনেক সস্তা।



