সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত চর্মরোগ। এতে শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার অস্বাভাবিক কার্যক্রমের কারণে ত্বকের কোষ দ্রুত তৈরি হয় এবং ত্বকের ওপর মোটা, শুষ্ক ও খসখসে ক্ষত তৈরি হতে পারে। রোগটি ছোঁয়াচে নয়—আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে এটি অন্যের শরীরে ছড়ায় না। এর একক কোনো কারণ নেই। বংশগত প্রবণতা, রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে এর জন্য দায়ী হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সোরিয়াসিসের ইতিহাস থাকলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু বিষয় রোগটি শুরু করতে বা পুরোনো উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—
• মানসিক চাপ
• ত্বকে কাটা, ঘষা বা আঘাত জনিত সংক্রমণ
• ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া
• ধূমপান
• অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ
• কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ
• অতিরিক্ত রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়া
তবে এসব কারণ সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না।
সোরিয়াসিসের লক্ষণ
এর লক্ষণ রোগের ধরন, আক্রান্ত স্থানের অবস্থান ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত আক্রান্ত স্থানে—
• ত্বকের স্বাভাবিক অংশের তুলনায় আক্রান্ত স্থান উঁচু হয়ে লাল, গোলাপি কিংবা গাঢ় রঙের দেখা দিতে পারে। ত্বকের রঙের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ক্ষতের চেহারা একরকম নাও হতে পারে।
• ক্ষতের ওপর শুকনো সাদা বা রুপালি ধরনের আঁশ তৈরি হতে পারে। এগুলো ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে এবং আক্রান্ত স্থান খসখসে দেখায়।
• আক্রান্ত ত্বকে চুলকানি, জ্বালাপোড়া, স্পর্শে অস্বস্তি কিংবা ব্যথা হতে পারে। কারো ক্ষেত্রে উপসর্গ হালকা থাকে, আবার কারো দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
• ত্বক শুষ্ক হয়ে শক্ত ও রুক্ষ হতে পারে। গুরুতর শুষ্কতায় ত্বকে ফাটল তৈরি হয়ে ব্যথা বা রক্তপাতের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
• মাথার ত্বকে মোটা আঁশযুক্ত ক্ষত তৈরি হতে পারে। এটি কখনো সাধারণ খুশকির মতো মনে হলেও সোরিয়াসিসের ক্ষত সাধারণত বেশি মোটা ও স্পষ্ট হয়।
• কনুই ও হাঁটুর বাইরের অংশে সোরিয়াসিসের ক্ষত প্রায়ই দেখা যায়। মাথার ত্বক, কোমরের আশপাশ এবং শরীরের অন্যান্য স্থানও আক্রান্ত হতে পারে।
• নখে ছোট ছোট গর্ত, বিবর্ণতা, ভঙ্গুরতা, মোটা হয়ে যাওয়া, নখের নিচে পরিবর্তন কিংবা নখের বিছানা থেকে আলগা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
• কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ত্বকের পাশাপাশি জয়েন্ট আক্রান্ত হতে পারে। জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, নড়াচড়ায় অস্বস্তি বা সকালে দীর্ঘসময় শক্তভাব থাকলে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের সম্ভাবনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
• গুরুতর অবস্থায় শরীরের বড় অংশজুড়ে তীব্র লালভাব, শুষ্কতা ও ত্বকের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি বা দুর্বলতা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
সোরিয়াসিসের প্রকারভেদ
• প্লাক সোরিয়াসিস : এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন। ত্বকে মোটা, উঁচু ও আঁশযুক্ত দাগ তৈরি হয়। কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বকসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা দিতে পারে।
• গাটেট সোরিয়াসিস : শরীরে ছোট ছোট ফোঁটা বা বিন্দুর মতো অসংখ্য দাগ তৈরি হয়। শিশু ও তরুণদের মধ্যে কোনো কোনো সংক্রমণের পর এটি দেখা দিতে পারে।
• ইনভার্স সোরিয়াসিস : বগল, কুঁচকি, স্তনের নিচে বা শরীরের অন্যান্য ভাঁজে মসৃণ ও লালচে ক্ষত হয়। ঘাম ও ঘর্ষণের কারণে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
• পাস্টুলার সোরিয়াসিস : ত্বকে পুঁজের মতো দেখতে ছোট ফুসকুড়ি তৈরি হয়। এটি শরীরের নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে অথবা গুরুতর ক্ষেত্রে বিস্তৃত হতে পারে।
• এরিথ্রোডার্মিক সোরিয়াসিস : এটি বিরল কিন্তু গুরুতর ধরন। শরীরের অধিকাংশ অংশে তীব্র লালভাব ও ত্বকের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
• নখের সোরিয়াসিস : নখে গর্ত, বিবর্ণতা, ভঙ্গুরতা, মোটা হয়ে যাওয়া বা নখ আলগা হওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যায়।
• সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস : ত্বকের পাশাপাশি জয়েন্ট আক্রান্ত হলে তাকে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস বলা হয়। চিকিৎসা না করলে দীর্ঘমেয়াদি জয়েন্টের ক্ষতির ঝুঁকি থাকতে পারে।
জটিলতা
সোরিয়াসিসকে অনেকেই শুধু ত্বকের ওপরের একটি সমস্যা মনে করেন। কিন্তু এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ, যার প্রভাব কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ত্বকের বাইরেও পড়তে পারে। তাই দীর্ঘদিনের সোরিয়াসিসকে অবহেলা না করে রোগের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস। এতে হাত-পা, হাঁটু, গোড়ালি বা অন্যান্য জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা ও শক্তভাব দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা না হলে দীর্ঘ মেয়াদে জয়েন্টের ক্ষতি ও চলাফেরায় সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব
হাত, পা, মুখ বা মাথার মতো দৃশ্যমান স্থানে ক্ষত হলে সামাজিক ও কর্মজীবনে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তীব্র চুলকানি বা ব্যথার কারণে ঘুম ও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে পারে।
গুরুতর সোরিয়াসিসে জরুরি ঝুঁকি
বিরল ক্ষেত্রে এরিথ্রোডার্মিক সোরিয়াসিস বা ব্যাপক পাস্টুলার সোরিয়াসিসের মতো গুরুতর অবস্থা তৈরি হতে পারে। শরীরের অধিকাংশ অংশ দ্রুত লাল হয়ে যাওয়া, তীব্র দুর্বলতা, জ্বর, কাঁপুনি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সোরিয়াসিস থাকা মানেই এসব জটিলতা হবেই—এমন নয়। বরং লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জয়েন্টে ব্যথা বা ফোলা শুরু হলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



