ভয়ংকর পুলিশ: পর্ব-৮

গণ-অভ্যুত্থানে নিপীড়ন চালাতে হাসিনার কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা নেন মনিরুল

গণ-অভ্যুত্থানে নিপীড়ন চালাতে হাসিনার কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা নেন মনিরুল

আগে কথা বলতেন ক্যামেরার সামনে। এখন দেশের বাইরে পলাতক হয়ে নিজের ফেসবুক থেকে উঁকি দেন তিনি। কথা বলেন প্রমিত বাংলায়। কথা শুনে মনে হবে এমন ভালো মানুষ আর দেশপ্রেমিক হয়না। অথচ রক্ত দাগ এখনো শুকায়নি। ৫ আগস্টের জুলাই বিপ্লবের একদিন আগে আরেক পলাতক গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা নিয়েছিলেন খুন করে, গুম করে, গুলি করে ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন বিপ্লবে থামিয়ে দিতে। শুধু তাই নয় পুলিশের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গ্রুপিং করতেন তিনি। হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনে দুই টুকরা করা হয় পুলিশ প্রশাসনকে। দুই গ্রুপের একটার মস্তানি ছিলো তার হাতে। ভালো মানুষের ভাব ধরা এই মানুষটাই জঙ্গি অর্থায়নের সুবিধাভোগী। কথিত এই পুলিশ অফিসারের বাড়িও গোপালগঞ্জে। হাসিনার লাঠিয়াল এই অফিসারের নাম মনিরুল ইসলাম। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান। আমার সিলেট এর ভয়ংকর পুলিশের ধারাবাহিক পর্বের ৮ম পর্ব মনিরুলকে নিয়ে। পাঠকদের সামনে ফ্যাসিবাদী সময়ে মনিরুলের কীর্তি-কলাপ তুলে ধরা হলো:

 

মনিরুল সেই ক্রীড়নকদের একজন, যারা স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পদলেহন করতো। শুধু তাই নয়, এই এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম বৈষয়িক লোভ-লালসার স্বার্থে এহেন কোনো কাজ নেই যা তিনি করতেন না। বলা যায়, স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের জনগণ বিরোধী সকল কর্মকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন মনিরুল ইসলাম।

২০১৩ সালে তিনি যখন ডিবির প্রধান, তখন বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যার অন্যতম হোতাদের একজন ছিলেন। এছড়া তার সাথে ডিবির তৎকালীন এডিসি এবং বর্তমানে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমানও ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার একজন বড় ক্রিমিনাল ও কিলার।

নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট মনিরুল ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনকে দমন করার জন্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনার কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা নিয়েছিলেন। হাসিনা সরকারের কাছ থেকে টাকা এনে নিজের কক্ষে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই টাকা বিতরণ করার আগেই ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ওই দিন থেকে আর অফিসে যাননি মনিরুল।

বিসিএস ১৫ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে। হাসিনার শাসনামলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ও এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীতে দুটি গ্রুপ গড়ে। এই দুই গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন মহলের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। দুই গ্রুপের নেতৃত্ব দেওয়া হাবিবুর ও মনিরুল চাইতেন তাদের নিজস্ব বলয়ের লোকজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং পাক এবং ঢাকায় থাকুক।

মনিরুল ইসলামের দুর্নীতির শেষ নেই। গত ১০ বছরে ক্রসফায়ারের হুমকি, তুলে নিয়ে ডিবি দিয়ে নির্যাতন, বিঘায় বিঘায় জমি দখল, বাড়ি দখল, ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি টাকা আদায়, মামলা বাণিজ্য, জঙ্গি নাটক সাজিয়ে মালিককে গ্রেপ্তার করে এনজিও ছিনতাই, শ্যালককে দিয়ে পিডব্লিউডির টেন্ডারবাজি এমন কোনো অনিয়ম নেই যা তিনি করেননি।

জঙ্গি দমনে কাজ করা এই মনিরুল নিজেই জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত ছিলেন। মনিরুল জঙ্গিবাদে অর্থদাতা হিসেবে পৃথিবী জুড়ে নিষিদ্ধ দুটি এনজিও পরিচালনায় জড়িত ছিলেন। ৭ বছরে এই দুই এনজিও মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান এনেছে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের নামে। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন হলে গা ঢাকা দেন নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়ানো এই পুলিশ কর্মকর্তা।

জানা যায়, বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক দুটি এনজিওর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মনিরুল ইসলাম। সূত্র অনুযায়ী, কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি নামে একটি এনজিও বাংলাদেশে তাদের প্রথম কার্যক্রম শুরু করে ১৯৯৪ সালে। এটি পরিচালনা করতেন একটি প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয়সারির নেতা মো. জামাল আব্দুল খালেক আল নুরী। প্রথমদিকে এনজিওটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণ ও ছিন্নমূল বয়স্ক মানুষের পুনর্বাসনের কাজ করতো। জঙ্গি দমনে গঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান হয়ে ২০১৬ সালে মনিরুল ইসলাম, কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি নামে এনজিওটির চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করেন। পরে এনজিওটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। নাম সংস্কার করে রাখা হয় কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ। এরপর দখল করেন শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেকটি এনজিও। জাতীয় এনজিও ব্যুরোর নথি বলছে, ২০১৭ সালে নভেম্বর মাসের ২ তারিখে কুয়েত জয়েন্ট কমিটি এনজিওটির নাম পরিবর্তন করা হয়। যাতে মনিরুল ইসলাম সুপারিশ করেন।

মনিরুলের তত্ত্বাবধানে এনজিও দুটি ভিন্ন নামে ভিন্ন রূপে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তার প্রভাবে এই এনজিও কার্যক্রম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পাননি। জানা যায়, জঙ্গিবাদে অর্থদাতা হিসেবে এই দুটি এনজিও আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এনজিও দুটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। বাংলাদেশেও এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি ২০১৭ সালে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অর্থ জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত ১৭টি এনজিওর তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই তালিকায় মনিরুল ইসলামের দখল করা এনজিও দুটির নামও ছিল। পরে কিছুটা নাম সংস্কার করে প্রভাব খাটিয়ে এনজিও দুটি দখলে নেন মনিরুল ইসলাম। গোপনে তিনি ওই এনজিওর মাধ্যমে কুয়েত থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যান। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি টের পেয়ে গেলে তিনি কৌশলে ওই এনজিওর মালিকানা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। পরে ২০১৮ সালে ২০শে জুন এনজিওটির চেয়ারম্যান বানানো হয় মনিরুল ইসলামের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনকে।

উল্লেখ্য, কেএসআর কুয়েত ভিত্তিক একটি খাদ্য বিতরণ এনজিও। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া এনজিওটির পূর্ব নাম ছিল রিভাইভাল অব দ্য ইসলামিক হেরিটেজ। নাইন ইলেভেনে যুক্তরাষ্ট্রের টু-ইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে এনজিওটির বিরুদ্ধে। এজন্য ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বের অনেক দেশে এনজিওটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামে দুটি এনজিও যত নির্মাণ কাজ করেছে তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে রেজাউল হক শাহীনেরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএস এন্টারপ্রাইজ। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজে সহায়তা প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এসবের মূল হোতা হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম।

নিজের প্রভাব খাটিয়ে এবং স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে মনিরুল ইসলাম অপরাধ জগতের সম্রাট হয়ে উঠেছিল। এছাড়া বিরোধী দলমত দমনে তার পৈশাচিক ভূমিকার কথা কারো অজানা নয়। শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতাকে রক্ষার জন্য এসব ঘৃণ্য অফিসারকে টাকার বিনিময়ে হাত করে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১