সিলেটে এখন আর বাড়ি মানে শুধু চার দেয়াল আর ছাদ নয়। বাড়ি মানে কেমন দেখাবে, কেমন আরাম দেবে। গত তিন বছরে সিলেট নগরী ও আশপাশের উপজেলায় ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের চাহিদা বেড়েছে অন্তত তিন গুণ। একসময় যা শুধু ঢাকার গুলশান-বনানীর বিলাসিতা মনে করা হতো, এখন তা সিলেটের মধ্যবিত্ত পরিবারেরও প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ কাজ করছে। সর্বোপরি, প্রবাসী আয়।

সিলেটের প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ লন্ডন, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। তারা দেশে বাড়ি বানাচ্ছেন এবং চাইছেন বিদেশের মতো ফিনিশিং। আগে টাইলস আর রং হলেই হতো, এখন চাই ফলস সিলিং, হিডেন লাইট, কিচেন কেবিনেট, ওয়াক-ইন ক্লোজেট। ফ্ল্যাট সংস্কৃতি এখন তুঙ্গে।

সিলেট নগরীতে গত ৫ বছরে প্রায় ২০০টি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ভবন হয়েছে: শাহজালাল উপশহর, আম্বরখানা, মেজরটিলা, সুবিদ বাজার এমনকি নগরীর উপকণ্ঠে বিভিন্ন এলাকায়। ছোট জায়গায় বেশি সুবিধা পেতে ইন্টেরিয়র ডিজাইন এখন বাধ্যতামূলক। একজন ডেভেলপার বলেন, “আগে ক্রেতারা জিজ্ঞেস করতেন স্কয়ার ফিট কত? এখন জিজ্ঞেস করেন, ইন্টেরিয়র করে দেবেন কি না?”

এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সিলেটে পর্যটন বাড়ায় নতুন হোটেল, ক্যাফে, জুয়েলার্স রং, বিউটি পার্লার, শোরুম হচ্ছে। তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে ডেকোরেশনে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে।

সিলেট ইন্টেরিয়র ডিজাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, সিলেটে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০টি ইন্টেরিয়র ফার্ম কাজ করছে। ৫ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১৫টিরও কম। একজন ডিজাইনারের মাসিক কাজের গড় বাজেট এখন ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা। শুধু কিচেন আর ফলস সিলিংয়ের কাজেই প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে নগরীতে।

জিন্দাবাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আগে মানুষ ফার্নিচার কিনত, এখন ফার্নিচার বানায়। দেয়ালের মাপ, ঘরের আলো-বাতাস মেপে।”

তবে চাহিদা বাড়লেও দক্ষ কারিগর সংকট রয়েছে। ভালো মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, থ্রিডি ডিজাইনার পাওয়া কঠিন। অনেক কাজ ঢাকা থেকে লোক এনে করাতে হয়, ফলে খরচ বাড়ে। এছাড়া নিম্নমানের বোর্ড ও ফিটিংসে বাজার সয়লাব, যা ১-২ বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টেরিয়র এখন আর শখ নয়, এটি বিনিয়োগ। সুন্দর ও গোছানো ঘরে মানসিক শান্তি বাড়ে, কাজের মনোযোগ বাড়ে, এমনকি বাড়ির বিক্রয়মূল্যও ২০-৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। সিলেটের ঘর এখন আর শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি রুচির পরিচয়। আর এই রুচিই তৈরি করে দিচ্ছে নতুন একটি কর্মসংস্থানের খাত, যেখানে ডিজাইনার, কারিগর, ইলেকট্রিশিয়ান, রং মিস্ত্রি, সবার জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *