নিজাম উদ্দীন সালেহ
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার মন্ডলপাড়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃশ্যটি বাংলাদেশের চিরায়ত চরিত্রকে তুলে ধরে। একটি দেয়ালের এপাশে মুসলমানরা নামাজ পড়ছেন, ওপাশে হিন্দুরা পূজা করছেন। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির ও ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত বেলতলা জামে মসজিদ প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কোনো সংঘাত ছাড়াই পাশাপাশি টিকে আছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক “টলারেন্স” এর স্তর পার করে “একসেপ্টেন্স” এ পৌঁছেছে। লালমনিরহাটের ঘটনায় দেখা যায়, মসজিদ ও মন্দির কমিটি যৌথভাবে চাঁদা তুলে মাঝখানের দেয়াল নির্মাণ করেছে। আজানের সময় পূজার ঢাক বন্ধ রাখা হয়, আবার পূজার সময় মসজিদের মাইকের আওয়াজ কমিয়ে দেওয়া হয়। এটি রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নয়, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র কখনো কোনো একটি ধর্মকে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে না। দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি, ঈদে সার্বজনীন উৎসব — উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র সকল নাগরিককে সমানভাবে দেখে। এর ঠিক বিপরীতে ভারতের বর্তমান চিত্রটি উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে যেখানে একই দেয়ালে মসজিদ-মন্দির সম্প্রীতির প্রতীক, ভারতে সেখানে বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির, জ্ঞানবাপী মসজিদ-কাশী মন্দিরকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। উপাসনালয়কে ভোটের বাক্সে পরিণত করা হয়েছে।
ভারতে বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী রাজনীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত হচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে মুসলিমদের বাড়ি-মসজিদ ভাঙা, গরুর মাংসের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা, এবং “লাভ জিহাদ” এর মতো কাল্পনিক তত্ত্ব দিয়ে সামাজিক বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্র কখনো কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এমন অবস্থান নেয়নি।
ভারতীয় মূলধারার একটি বড় অংশের মিডিয়া দিনরাত হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে উস্কে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়ায় এমন সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা প্রায় নেই বললেই চলে।
লালমনিরহাটের একটি ইটের দেয়াল প্রমাণ করে দেয়, ধর্ম কখনো বল প্রয়োগ ও বিভেদের কারণ হতে পারে না, যদি মানুষের মধ্যে মানবতা থাকে। বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হয়েও কীভাবে সংখ্যালঘুদের আগলে রাখা যায়। আর ভারত, যে দেশ নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র বলে দাবি করে, সেখানে আজ একটি মসজিদের পাশে মন্দির থাকা মানে দাঙ্গার আশঙ্কা।
একটি দেয়াল দুই দেশে দুই বার্তা দেয়, বাংলাদেশে দেয়ালটি মিলনের প্রতীক অপরদিকে ভারতে সেই দেয়ালটিই বিভাজনের দেয়াল হয়ে উঠেছে।
