মিসবাহ উদ্দিন :
সিলেটের বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। প্রতিনিয়ত সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ, মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবনের পথচলা। কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে একটি পরিবার, আবার কোনো ঘটনায় অকালে নিভে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় শিশু-কিশোর ও তরুণদের জীবন। প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বজনদের কাটাতে হচ্ছে দীর্ঘ জীবন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা উপজেলাজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা প্রশ্নের মুখে ফেলছে সড়কের নিরাপত্তা ও বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে।
বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং আগে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও অসচেতন চলাচল। ফলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষই সড়কে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
গত ১৩ অক্টোবর বিকেলে বিয়ানীবাজার পৌরশহরের দিঘিরপাড় এলাকায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় হাসান আহমদ (১৪) নামে এক কিশোর নিহত হয়। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ও দুপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের মাটিজুরা গ্রামের মৃত আব্দুর রউফের ছেলে ফাহাদ আহমদ (২৩) এবং একই ইউনিয়নের ভরাউট গ্রামের বকতিয়ার মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দিন (৩০)।
গত ৪ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার চারখাই এলাকায় ট্রাকের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। একই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেওলা সেতুর টোল এলাকায় ট্রাকের চাপায় আরেক চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ছাড়া চারখাই এলাকায় ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আবু বকর সাইফুল্লাহ (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হয়। সে উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের দুধবকশী গ্রামের বাসিন্দা। ওই ঘটনায় রাইহান আহমদ (২০) নামে আরও এক যুবক গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে সিলেটে পাঠানো হয়। এর পরদিন বিকেল পৌনে ৫টার দিকে উপজেলার সাচান এলাকায় সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের কাঠলী ব্রিজসংলগ্ন স্থানে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে।
একের পর এক এসব দুর্ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। প্রতিদিন প্রয়োজনের তাগিদে সড়কে বের হওয়া মানুষ জানেন না, কখন একটি দুর্ঘটনা তাঁদের কিংবা তাঁদের পরিবারের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। বিশেষ করে তরুণ মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তরুণদের একাংশের প্রতিযোগিতামূলক মোটরসাইকেল চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি এবং ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণেও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং পথচারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনায় হতাহতের আশঙ্কা বাড়ায়।
বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারসংলগ্ন সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। এসব এলাকায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশক বসানোর বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিয়ানীবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল খালিক বলেন, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারের আশপাশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশক নিশ্চিত করতে হবে।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবিরের মতে, অতিরিক্ত গতির কারণে চালক যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারালে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনা কমাতে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে বিভাগের চার জেলার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির চিত্র উঠে এসেছে। রোববার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট জেলায় আটটি সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জে চারটি দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন। মৌলভীবাজারে নয়টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে হবিগঞ্জে পাঁচটি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার জেলার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মৌলভীবাজারে। সবচেয়ে কম নিহত হয়েছেন সুনামগঞ্জে। চার জেলায় মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, দুজন নারী ও দুজন শিশু। প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল এবং সিএনজি ও টমটমের চালক-আরোহীদের প্রাণহানির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার আটটি ঘটনায় ছয়জন, মুখোমুখি সংঘর্ষের আটটি ঘটনায় নয়জন এবং গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কার একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, দূরপাল্লার চালকদের ক্লান্তি ও অসতর্কতা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে। পাশাপাশি সড়কে নিয়মিত নজরদারি, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং চালকদের দক্ষতা যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সভাপতি শফিউর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ করা জরুরি। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি মহাসড়কে নিয়মিত নজরদারি ও চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে কর্মসূচি পালন করলেই হবে না; সারা বছর সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষক হোমাযুন রশিদ জায়দী বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক আইন অনুসরণ এবং বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন না চালানোর বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।”
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। অথচ সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিয়ানীবাজারে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি, চালকদের প্রশিক্ষণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি কিশোর-তরুণদের মধ্যে দায়িত্বশীল মোটরসাইকেল চালানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।
সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং চালক ও পথচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা না গেলে নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাবে। আর কোনো পরিবারকে যেন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করতে না হয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
