নিজাম উদ্দীন সালেহ

একটা খাতার পাতা। সেখানে কালো কালিতে লেখা ইংরেজি অক্ষর। কম্পিউটারে টাইপ করা মনে হলেও, ওটা হাতে লেখা। যে লেখা দেখে নাসা থেকে ফেসবুক, সবাই থমকে গিয়েছিল। সেই লেখার মালিক নেপালের এক কিশোরী, প্রকৃতি মল্লা। ২০১৭ সাল। প্রকৃতি তখন নেপালের সৈনিক আবাসিক মহাবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তার একটা লেখা খাতার ছবি তার এক বন্ধু ফেসবুকে পোস্ট করে। ক্যাপশন ছিল — “আমার ক্লাসমেটের হাতের লেখা”। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছবিটা ভাইরাল। ১ কোটির বেশি শেয়ার। বিশ্ব মিডিয়া খবর করল — “This is the most beautiful handwriting in the world”।


কী ছিল সেই লেখায়? প্রতিটি অক্ষর সমান মাপের, সমান দূরত্বে, কোনো কাটাকাটি নেই। লাইনগুলো স্কেল দিয়ে টানা মনে হয়, কিন্তু স্কেল ছাড়া। শিক্ষকরা বলেছিলেন, তার লেখা দেখলে মনে হয় প্রিন্টারের প্রিন্ট।
কিন্তু প্রকৃতি মল্লা হঠাৎ একদিনে এই লেখা শেখেনি।


প্রকৃতির মা বলেন, ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি খুব ধীরে লিখত। অন্য বাচ্চারা যখন ১ পৃষ্ঠা লিখে খেলতে যেত, প্রকৃতি তখনো আধা পৃষ্ঠায়। কারণ সে প্রতিটি অক্ষরকে ভালোবাসত। সে বলত, “একটা অক্ষর সুন্দর না হলে পুরো শব্দটা কুৎসিত লাগে।”
তার বাবা সেনাবাহিনীর সদস্য। বদলির চাকরি। প্রকৃতি ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলা শিখেছে। প্রতিদিন ভোর ৫টায় উঠে ১ ঘণ্টা শুধু হাতের লেখা প্র্যাকটিস করত। কোনো খাতা নয়, পুরোনো পত্রিকার ওপর লিখত, যাতে কাগজ নষ্ট না হয়।


তার অনুপ্রেরণা ছিল তার বড় বোন। বড় বোনের হাতের লেখাও সুন্দর ছিল। প্রকৃতি তাকে নকল করতে করতে একসময় নিজের স্টাইল বানিয়ে ফেলে। ভাইরাল হওয়ার পর কী হলো?
নেপাল সরকার তাকে সংবর্ধনা দিল। বিভিন্ন দেশ থেকে ক্যালিগ্রাফির জন্য ডাক এলো। কিন্তু প্রকৃতি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা দিল, সে তার লেখাকে বিক্রি করেনি। সে বলেছে, “আমি ডাক্তার হতে চাই, হাতের লেখা আমার শখ, পেশা নয়। “আজ প্রকৃতি মল্লা কলেজে পড়ে। তার হাতের লেখা এখন নেপালের পাঠ্যবইয়ে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়। অনেক স্কুলে “প্রকৃতি মল্লা হ্যান্ডরাইটিং” নামে প্রতিযোগিতা হয়।


এখান থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় কিছু বিষয় আছে। তা হচ্ছে, এই যুগে সবাই দ্রুত টাইপ করতে চায়, কেউ সুন্দর করে লিখতে চায় না। প্রকৃতি প্রমাণ করেছে, ধীরে কাজ করলেও যদি নিখুঁত করো, পৃথিবী একদিন তোমাকে খুঁজে নেবে।
প্রতিভা মানে শুধু গান, নাচ, আঁকা নয়। সুন্দর করে লেখাও একটা প্রতিভা। যেটাকে আমরা গুরুত্ব দিই না।


সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া মানেই নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। প্রকৃতি ভাইরাল হয়েও মাটিতে পা রেখেছে। সে এখনো আগের মতোই বিনয়ী আপনার সন্তানের হাতের লেখা খারাপ? বকা দেবেন না। একটা ভালো কলম কিনে দিন, একটা সুন্দর খাতা। প্রতিদিন ১৫ মিনিট সময় দিন। কে জানে, আপনার ঘরেই হয়তো পরের প্রকৃতি মল্লা বড় হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *