নিজাম উদ্দীন সালেহ
অর্থনীতি ডুবছে আর তার নিচে চাপা পড়ছে মানুষ। কাগজে রিজার্ভ, জিডিপি, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা, কিন্তু হাঁড়িতে ভাত নেই। আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল চিত্র্ বুঝতে হলে শেয়ারবাজার বা বাজেট বই নয়, যেতে হবে কাঁচাবাজারে।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে মানুষের বাজার মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশের ওপর।
গত দুই বছরে মোটা চাল ৫৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা, ডিম ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৭০ থেকে ২৫০ টাকা হয়েছে। অথচ একজন রিকশাচালক বা পোশাকশ্রমিকের আয় যা বেড়েছে, তা ১০ শতাংশও নয়। অর্থাৎ, আয় এক জায়গায়, খরচ তিনগুণ।
এর নামই হলো মানুষের দুর্ভোগ। সিলেটের জনৈক রেহানা বেগমের কথা শুনুন। স্বামী বিদেশে থাকতেন, এখন রেমিট্যান্স কমে গেছে। তিনি বলেন, “আগে মাসে ১৫ হাজার টাকায় সংসার চলত, এখন ২৫ হাজারেও চলে না। ছেলের পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা দিতে গিয়ে চাল কেনার টাকা শেষ।”
এই দুর্ভোগের কারণ মূলত তিনটি। সরকার আয় করতে পারে না, কিন্তু খরচ করে। ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। টাকা ছাপালে টাকার দাম কমে, জিনিসের দাম বাড়ে। এর দায় সাধারণ মানুষের নয়, কিন্তু মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
ঢাকা থেকে সিলেটে এক ট্রাক পেঁয়াজ আসতে ৫ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। সেই চাঁদা যোগ হয় পেঁয়াজের দামে। বড় বড় আমদানিকারকরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। রমজান আসলে চিনি, খেজুর, ছোলার দাম বাড়ে, প্রতি বছর একই নাটক, কিন্তু সরকার কিছুই করতে পারে না। কারণ, সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে।
ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে ১২৪ টাকা হয়েছে। আমরা যা খাই, যা পরি, তার বেশিরভাগই আমদানি নির্ভর- সার, বীজ, যন্ত্রাংশ, জ্বালানি। ডলারের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে পারছেন না, ব্যাংক ডলার দিচ্ছে না। ফলে সরবরাহ কমছে, দাম বাড়ছে।
ফলাফল কী? মানুষ খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মানুষ এখন আমিষ খাওয়া ১৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত মাংস খাওয়া বন্ধ করেছে, নিম্নবিত্ত ডিম খাওয়া বন্ধ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ পরিবার সন্তানের শিক্ষা খরচ কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি শুধু পেটে লাথি মারছে না, ভবিষ্যতেও লাথি মারছে।
অর্থনীতি ডুবছে বললে সরকার বলে, বিশ্বমন্দা। কিন্তু বিশ্বে তো চালের দাম কমেছে, তেলের দাম কমেছে। বাংলাদেশে কেন বাড়ে? কারণ, আমাদের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে লুটেরা ও সিন্ডিকেটের হাতে, নীতিনির্ধারকদের হাতে নয়। যদি এখনই লাগাম টানা না হয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো বন্ধ, খেলাপি ঋণ উদ্ধার, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দুর্ভিক্ষে রূপ নেবে। অর্থনীতি ডুবলে সরকার ডোবে না, ডোবে মানুষ। সেই ডোবা এখন শুরু হয়ে গেছে।
