আমার সিলেট ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসন নিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ ও রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এই লড়াইয়ের ফলাফল শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কৌশলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মিশিগানের এই নির্বাচনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আরব-আমেরিকান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রগতিশীল নীতির গ্রহণযোগ্যতা এই লড়াইকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

কারা এই দুই প্রার্থী?
৪২ বছর বয়সী আবদুল এল-সায়েদ একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি এর আগে ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মিশরীয় বংশোদ্ভূত এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হবেন।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন তিনি। এবারের নির্বাচনে এল-সায়েদ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ৬৩ বছর বয়সী মাইক রজার্স সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা। ২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান তিনি।
রজার্স ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি কর কমানো, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পক্ষে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ট্রাম্পের যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও সংঘাতের অবসান চেয়েছেন তিনি।

মিশিগানের এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মিশিগানের সিনেট আসনটি বর্তমানে অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের দখলে রয়েছে। এই আসনে রিপাবলিকানদের জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
রজার্স জয়ী হলে গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেট মিশিগানের সিনেট আসনটি অন্তত ছয় বছরের জন্য রিপাবলিকানদের হাতে চলে যাবে।
তবে এই লড়াই শুধু সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নয়। ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মসূচি একটি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে কি না, সেটিও এই নির্বাচনের বড় পরীক্ষা।
আর এল-সায়েদ জয়ী হলে তা ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রচারণার কৌশলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মুসলিম পরিচয় ঘিরে বিতর্ক:
নির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয়ও বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। ট্রাম্প ও রজার্সের পক্ষ থেকে তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বারবার আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে মিশিগানের ভোটাররা একজন মুসলিম প্রার্থীকে সিনেটর হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
আরব-আমেরিকান রাজনৈতিক কর্মী চাদি আবদুলরাজেক, যিনি এল-সায়েদের পক্ষে প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন, তিনি বলেন, এই নির্বাচন মুসলিম ও আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তার মতে, ভোটের মাধ্যমে এই সম্প্রদায় নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে চায়।

আলোচনায় হ্যালি স্টিভেন্স:
নির্বাচনের আগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এল-সায়েদের কাছে পরাজিত হওয়া স্টিভেন্সের বাগদত্তা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এল-সায়েদের অবস্থানের সমালোচনা করে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন জানান।
স্টিভেন্স নিজেও ইসরায়েল বিষয়ে এল-সায়েদের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তবে শুরুতে তিনি বলেছিলেন, সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
তবে গত রোববার অবস্থান পরিবর্তন করে রজার্সের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তাকে সমর্থন জানান স্টিভেন্স। এর আগে তিনি রজার্সের সঙ্গে একটি গির্জার প্রার্থনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন।
স্টিভেন্স বলেন, “আমি ঘৃণার পরিবর্তে দেশকে বেছে নিচ্ছি।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার এই সিদ্ধান্ত মুসলিমবিরোধী নয়।
স্টিভেন্সের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার একে “ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা” বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, এল-সায়েদ স্টিভেন্সের সমালোচনায় গুরুত্ব দিতে চান না বলে জানিয়েছেন।

নির্বাচনের ফল কী প্রভাব ফেলতে পারে?
মিশিগানের এই সিনেট নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভারসাম্য, মুসলিম ও আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এবং ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে এল-সায়েদের সম্ভাব্য জয় প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। আর রজার্সের জয় রিপাবলিকানদের সিনেটে অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *