মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কমছে সার উৎপাদন।
বাড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যের দাম, কৃষি, মানুষের আয়-রোজগার থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানেও। সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল এমন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে মূল্যায়নটি করা হয়। এই সতর্কতা মাথায় রেখে কর্মসংস্থানের দিকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের দেশের অর্থনীতিতে যত চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে বড় একটি হলো কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ না হওয়া। বর্তমান সরকারের নেয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাগুলো যে চ্যালেঞ্জিং ও ত্রুটিপূর্ণ তা এখন স্পষ্ট। সরকার ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে ৩৩ লাখের বেশি এবং সেবা খাতে প্রায় ৫৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
কৃষি খাতেও প্রায় ছয় লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। লক্ষ্যগুলো ইতিবাচক হলেও দেশের বেসরকারি খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং শ্রমবাজারের চাহিদা ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় পরিকল্পনাগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সে প্রশ্ন থেকে যায়।
দেশে কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বেসরকারি খাত নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে, জ্বালানি সংকট যার মধ্যে প্রধানতম। অন্যদিকে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেই। বিনিয়োগও নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ শতাংশের ঘরে। বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি-বেসরকারি বিনিয়োগ অনুপাত ছিল ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা গত অর্থবছর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। একই সময়ে জিডিপি-সরকারি বিনিয়োগের অনুপাতও কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে। অর্থাৎ দেশে নতুন শিল্পায়ন, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে।
এ বাস্তবতায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে, যেখানে সরকারি কর্মসংস্থানেও গতি শ্লথ। সুতরাং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কাঠামোগত সংস্কার। দেশের শ্রমবাজারের বড় সমস্যা হলো শিক্ষা ও দক্ষতার অসামঞ্জস্য। দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবার কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন না।
ফলে শুধু শিক্ষা বিস্তার নয়, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করা জরুরি। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ, শিক্ষানবিস কর্মসূচি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং দক্ষতা উন্নয়নকে কর্মসংস্থান পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও দক্ষ জনবল আবশ্যক।
প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ শ্রমের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশ দিন দিন আরো কঠোর হচ্ছে। এদিকে বিদেশে কর্মী প্রেরণে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতাসম্পন্ন জনবলের অভাব ও অবৈধ অভিবাসন। এর জন্য বৈদেশিক শ্রমবাজার এরই মধ্যে সংকুচিত হয়েও এসেছে। যদিও প্রতি বছর বিদেশে গমনেচ্ছু মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিন্তু বিদেশগামীদের বড় অংশ স্বল্প দক্ষ কাজে নিয়োজিত থাকে। সুতরাং এক্ষেত্রে প্রকৃত প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলা আবশ্যক। আর এটি স্থানীয় শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন।
দেশে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের প্রায় ৯৪ শতাংশ স্বল্প দক্ষ, যা বিশ্বব্যাংকের ‘বিল্ডিং হিউম্যান ক্যাপিটাল হয়্যার ইট ম্যাটার্স: হোমস, নেবারস অ্যান্ড ওয়ার্কপ্লেস’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অথচ তারা দক্ষ হলে কর্মসংস্থানের পরিসর বৃদ্ধি সুযোগ তৈরি হতে পারে। সুতরাং সার্বিকভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। এসব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা অর্জন করা কঠিন হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে তত দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ শ্রমবাজারে প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়বে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এরই মধ্যে বিষয়গুলো দেশের বিভিন্ন শ্রমবাজারের জন্য বাস্তব হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশের শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়বে তা সহজেই অনুমেয়। ফলে আগামীতে প্রচলিত শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থান যে একই অনুপাতে বাড়বে সেই নিশ্চয়তা ও বাস্তবতা নেই।
সরকার যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন করতে চায় তাহলে বেসরকারি খাতের গতি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জনবল তৈরিতেও মনোযোগ দিতে হবে। কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু কী পরিমাণ কর্ম সৃজন হবে সেটি না রেখে কী ধরনের শ্রম চাহিদা সৃষ্টি হবে এবং সেগুলোর জন্য কেমন দক্ষতা প্রয়োজন হবে সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এছাড়া প্রযুক্তিগত দক্ষতা কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতেও প্রয়োজন হবে। দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সেবা খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সেবা খাতের আকার বাড়লেই শোভন কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। এ খাতের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক। অনেক কর্মীর নিয়োগপত্র নেই, নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো নেই, সামাজিক নিরাপত্তা নেই; এমনকি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা সুরক্ষাও নিশ্চিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। তাই আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শোভন কাজের সুযোগ তৈরি। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক



