শুধু উত্তর নয়, কাজও করবে: মেটার নতুন এআই ‘মিউজ’ মেটার নতুন ব্যক্তিগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট ‘মিউজ’। ছবি: Meta

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আমাদের পরিচয়টা এতদিন মূলত প্রশ্ন করা আর উত্তর পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কী লিখতে হবে, কোথায় তথ্য পাওয়া যাবে, কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে কীভাবে সমাধান করা যায়, এসব কাজে এআই সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এবার সেই ধারণাটাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে চাইছে মেটা।

 

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা নিয়ে এসেছে ‘মিউজ’ (Muse), একটি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট। মেটার দাবি, এটি শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি নয়, বরং ব্যবহারকারীর হয়ে বাস্তব কাজও করতে পারবে। লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে পরিকল্পনা তৈরি, ওয়েব ব্রাউজিং, ফর্ম পূরণ কিংবা নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা, সবকিছুর সঙ্গেই যুক্ত হতে পারবে মিউজ।

 

চ্যাটবট থেকে এআই এজেন্ট

 

মিউজকে বুঝতে হলে ‘চ্যাটবট’ আর ‘এআই এজেন্ট’-এর পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। সাধারণ চ্যাটবটের কাছে প্রশ্ন করলে সেটি উত্তর দেয়। কিন্তু এআই এজেন্টকে একটি লক্ষ্য দিলে সেটি সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য কয়েকটি ধাপে কাজ করার চেষ্টা করতে পারে।

 

মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারী শুধু মিউজকে বলবেন কী করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী এটি পরিকল্পনা তৈরি করতে, ওয়েব ব্রাউজ করতে, বিভিন্ন ফর্ম পূরণ করতে এবং নির্দিষ্ট কাজ এগিয়ে নিতে পারবে। কোনো কাজ দীর্ঘ সময়ের হলে ব্যবহারকারী অ্যাপ বন্ধ করে দিলেও মিউজ পেছনে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত বা অনুমোদনের প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারীর কাছে অনুমতি চাইবে।

 

অর্থাৎ, ‘আমাকে কীভাবে করতে হবে বলো’ থেকে প্রযুক্তিটি ধীরে ধীরে ‘আমার হয়ে কাজটা করে দাও’ পর্যায়ে যাচ্ছে।

 

ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে মিউজ

ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারবে মেটার ‘মিউজ’। ছবি: Meta

মিউজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যক্তিগতকরণ। মেটা বলছে, ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে পারবে মিউজ। ফলে ভবিষ্যতে একই তথ্য বারবার দিতে হবে না।

 

ধরা যাক, কেউ ইনস্টাগ্রামে একটি রান্নার ভিডিও সংরক্ষণ করলেন। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে মিউজকে বাজারের তালিকা তৈরি করতে বলা যেতে পারে। এমনকি ব্যবহারকারীর আগে বলা তথ্য মনে রেখে রাতের খাবারের পরিকল্পনা বা অতিথিদের জন্য প্রস্তুতির মতো কাজেও সহায়তা করতে পারবে এটি।

 

এখানেই মিউজকে সাধারণ এআই সহকারীর চেয়ে আলাদা করে দেখাতে চাইছে মেটা। ব্যবহারকারী কী জানতে চাইছেন, তার পাশাপাশি তিনি কী করতে চাইছেন, সেটিও বোঝার চেষ্টা করবে এই প্রযুক্তি।

 

ওয়েব ব্রাউজ করবে, কাজও করবে

 

মিউজের পেছনে রয়েছে ‘Muse Secure VM’, অর্থাৎ মিউজের জন্য তৈরি একটি আলাদা নিরাপদ ভার্চুয়াল কম্পিউটার। এর নিজস্ব ব্রাউজার রয়েছে, যার মাধ্যমে এটি ওয়েবসাইটে গিয়ে বিভিন্ন কাজ করতে পারে। মেটার উদাহরণ অনুযায়ী, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা, ফর্ম পূরণ করা কিংবা গ্রাহকসেবার কাজ সামলানোর মতো কাজেও এটি ব্যবহার করা যাবে।

 

কেন আলাদা ভার্চুয়াল কম্পিউটার প্রয়োজন? কারণ কোনো এআইকে যদি ব্যবহারকারীর হয়ে ওয়েবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেটা বলছে, মিউজের কাজের জন্য আলাদা পরিবেশ রাখা হয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারীর তথ্য ও সংযুক্ত সেবার প্রয়োজনীয় তথ্য সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

সব কাজ কি নিজে থেকে করবে?

 

না। মিউজের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে মেটা। ব্যবহারকারী ঠিক করতে পারবেন কোন কোন অ্যাপ বা সেবার সঙ্গে মিউজ যুক্ত হবে এবং কী ধরনের অনুমতি পাবে।

 

সংবেদনশীল কাজের ক্ষেত্রেও মিউজ ব্যবহারকারীর অনুমতি চাইবে। যেমন কোনো ই-মেইল পাঠানো বা কেনাকাটা করার আগে অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মেটা আরও জানিয়েছে, ব্যবহারকারী মিউজ কী কী কাজ করেছে এবং কী করার পরিকল্পনা করেছে, তার একটি হিসাব দেখতে পারবেন।

 

এমনকি মিউজকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য ভুলে যেতে বলার সুযোগও থাকবে। ব্যবহারকারীরা চাইলে তাদের কথোপকথন এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহারের বিষয় থেকেও বিরত থাকতে পারবেন বলে জানিয়েছে মেটা।

 

কেনাকাটাতেও এআই

 

মিউজ শুধু তথ্য খোঁজা বা ওয়েবসাইটে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহার করা যাবে।

 

মেটার তথ্য অনুযায়ী, মিউজের মাধ্যমে কেনাকাটার সময় Stripe-এর Link ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আসল কার্ডের তথ্য গোপন রেখে একবার ব্যবহারযোগ্য কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। Shop Pay এবং 1Password-এর মতো আরও সেবা ভবিষ্যতে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

এবার মিউজ যাবে চশমাতেও

ভবিষ্যতে এআই চশমার সঙ্গেও যুক্ত হবে মেটার মিউজ। ছবি: Meta

মিউজের ভবিষ্যৎ শুধু মোবাইল বা কম্পিউটারেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না মেটা। সেপ্টেম্বরের Connect 2026 অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসে মিউজকে তাদের এআই চশমায় যুক্ত করা হবে।

 

এর ফলে ব্যবহারকারী চশমা পরা অবস্থায় মিউজের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। সামনে থাকা কোনো পণ্য, দেয়ালে লাগানো বিজ্ঞপ্তি কিংবা দীর্ঘ কোনো তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেটি দেখে মিউজকে প্রশ্ন করা সম্ভব হবে। এমনকি সেই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী কাজও করতে পারবে এআই এজেন্টটি।

 

এটি এআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ তখন এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আলাদা করে ফোন হাতে নেওয়া বা কম্পিউটারের সামনে বসার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

 

মিউজ ইমেজ, আরেক দিগন্ত

 

মিউজ নামটি শুধু ব্যক্তিগত এআই এজেন্টের ক্ষেত্রেই নয়, মেটার নতুন ছবি তৈরির প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। জুলাইয়ে মেটা ‘Muse Image’ চালু করে, যা জটিল নির্দেশনা বুঝে ছবি তৈরি ও সম্পাদনা করতে পারে। একাধিক ছবির উপাদান মিলিয়ে নতুন ছবি তৈরি, নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন কিংবা ছবির ওপর সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে সম্পাদনার সুবিধাও এতে রয়েছে।

 

মেটা জানিয়েছে, Muse Image-এর তৈরি ছবিতে অদৃশ্য ‘Content Seal’ বা উৎস শনাক্ত করার সংকেতও যুক্ত করা হয়, যাতে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি কি না তা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়।

 

সামনে যে প্রশ্নগুলো

 

মিউজ যত বেশি মানুষের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে, ততই সামনে আসবে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্ন। একজন এআই এজেন্ট যদি ই-মেইল পড়তে পারে, ওয়েবসাইটে যেতে পারে, কেনাকাটা করতে পারে এবং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ মনে রাখতে পারে, তাহলে ভুল নির্দেশনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কাজের ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

মেটা এ কারণে মিউজের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুমতির কাঠামো এবং ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে। ভবিষ্যতে ‘Muse Confidential VM’ নামে আরও শক্তিশালী গোপনীয়তা ব্যবস্থা আনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে ব্যবহারকারীর তথ্য ও কথোপকথন এমনভাবে এনক্রিপ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে যাতে চাবি শুধু ব্যবহারকারীর কাছেই থাকে।

 

এআই কি এবার ‘সহকারী’ থেকে ‘কর্মী’?

 

মিউজের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। এতদিন এআইকে আমরা মূলত এমন একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখেছি, যে দ্রুত তথ্য খুঁজে দিতে পারে, লেখা তৈরি করতে পারে কিংবা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। মিউজ সেই সম্পর্কটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

এখন প্রশ্নটি শুধু ‘এআই কী জানে’ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এআই আমার হয়ে কী করতে পারে?’

 

মেটার মিউজ সেই প্রশ্নেরই একটি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা। এটি এখনো প্রযুক্তির বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত তথ্য, ওয়েব ব্রাউজিং, যোগাযোগ, কেনাকাটা এবং দৈনন্দিন কাজকে এক জায়গায় এনে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হলে ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের ধরন বদলে যেতে পারে।

 

আর তখন হয়তো এআইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু প্রশ্ন-উত্তরের থাকবে না। বরং জীবনের ছোট-বড় অনেক কাজের নেপথ্যে নীরবে কাজ করা এক ডিজিটাল সহকারীতে পরিণত হবে এআই।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১