সিলেটের ভূগর্ভে বিপুল শিলাসম্পদ

অবকাঠামোগত উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান শিলাপাথর। সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, নদীশাসন কিংবা নগরায়ণের প্রতিটি ছোট-বড় প্রকল্পে ভাঙা পাথর বা অ্যাগ্রিগেটের প্রয়োজন হয়। এই নির্মাণসামগ্রীর জন্য বাংলাদেশ এখনো অনেকাংশে বিদেশনির্ভর। আমদানি করে প্রয়োজন মেটাতে হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূতত্ত্ব বিভাগের এক গবেষণা বলছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেটের নদী ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বিপুল পরিমাণ শিলাসম্পদ রয়েছে। এ সম্পদ পরিকল্পিতভাবে আহরণ ও ব্যবহার করা গেলে দেশের অবকাঠামো খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ভূতত্ত্ববিদ গবেষক মো. খাইরুল কবির আদিল এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা গবেষণা পরিচালনা করেন। তাদের গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে নদীপথে নেমে আসা পাথর দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সিলেটের ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া, ডাউকি নদী, জাফলং ও জয়ন্তিয়া এলাকার বোল্ডার ও গ্র্যাভেল জমা হয়েছে।

 

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া ও ডাউকি নদী এলাকায় ৩ দশমিক ৪৮ মিটার গভীরতায় জমে থাকা গ্র্যাভেল ও বোল্ডারের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার অর্থাৎ প্রায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার। দৃশ্যমান বড় বোল্ডারের মধ্যে শুধু ভোলাগঞ্জেই রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৬০ ঘনমিটার। রাংপানি ছড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯১ ঘনমিটার এবং ডাউকি নদীতে ১ লাখ ৭২ হাজার ৮২১ ঘনমিটার পাথর রয়েছে।

 

গবেষকরা জানান, কিছু পিডমন্ট অঞ্চলে পাথরের স্তর ৯ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় বিস্তৃত হতে পারে, যা এখনো পুরোপুরি জরিপের আওতায় আসেনি। বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো গেলে সিলেট অঞ্চলে শিলাসম্পদের প্রকৃত পরিমাণ বর্তমান হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।

 

গবেষণায় উঠে এসেছে, সিলেট অঞ্চলের পাথরের মধ্যে গ্রানাইট, কোয়ার্টজাইট, ব্যাসল্ট ও গ্লাইসজাতীয় শিলা রয়েছে; যা প্রকৌশলগত মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। এসব শিলার আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৬৫ থেকে ৩.১২, আর পানি শোষণ হার মাত্র ০.৩ থেকে ১.০৪ শতাংশ; যা কম ছিদ্রতা, অধিক স্থায়িত্ব এবং কংক্রিটের সঙ্গে ভালো বন্ধন তৈরির সক্ষমতা নির্দেশ করে। পরীক্ষায় এসব শিলার সংকোচন সহনশীলতা পাওয়া গেছে ১১ হাজার থেকে ২৭ হাজার ৫০০ পিএসআই পর্যন্ত। এছাড়া ক্ষয় পরীক্ষা, আঘাত সহনশীলতা এবং রাসায়নিক স্থায়িত্ব পরীক্ষায়ও ইতিবাচক ফল মিলেছে। ফলে এসব পাথর সড়ক নির্মাণ, রেলপথের ব্যালাস্ট, নদীতীর সংরক্ষণ, সেতুর সংযোগপথ এবং জলবাহী কাঠামো নির্মাণে ব্যবহারের উপযোগী।

আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ

মেগা প্রকল্প যেমন: এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, নতুন রেললাইন, নদীশাসন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে বিপুল পরিমাণ পাথরের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই সিলেটের শিলাসম্পদ কাজে লাগাতে পারলে বিদেশ থেকে পাথর আনার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পরীক্ষাগার, পরিবহণব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে

গবেষক খাইরুল কবির আদিল জানান, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে সিলেটের শিলাসম্পদ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এ সম্পদ দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। যথাযথ পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি সহায়তা এবং টেকসই উত্তোলন নীতি নিশ্চিত করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, সিলেটের মাটি ও নদীর নিচে লুকিয়ে থাকা এই সম্পদকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি এবং সংরক্ষণ করতে হবে। নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদকে বুঝে সংরক্ষণ করে কাজে লাগাতে পারলেই এর সুফল পাওয়া যাবে।

পরিবেশগত ঝুঁকিও বড় উদ্বেগ

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে পরিবেশগত ঝুঁকির আশঙ্কাও। সিলেটের পর্যটননির্ভর অঞ্চল অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলন করা হলে তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তলদেশ গভীর, ভাঙন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সৌজন্যে : যুগান্তর

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪৬
  • ১১:৫২
  • ৪:২৭
  • ৬:৩৩
  • ৭:৫৫
  • ৫:০৮