
সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গুলিতে নিহত নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ। ছবি: আমিন আবদুল্লাহর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট
১৮ মে সকাল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে (মসজিদ) তখন দুই কিশোর বন্দুকধারী হামলার চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ান এক অকুতোভয় ব্যক্তি। তিনি এক সম্ভাব্য ভয়াবহ রক্তপাত রুখে দেন। নিজের জীবনের বিনিময়ে বহু শিশুসহ অনেকের প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করেন।
সান ডিয়েগো শহরের পুলিশ কমিশনার অকুতোভয়ের এ ব্যক্তিকে ‘বীর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি হলেন আমিন আবদুল্লাহ।
আমিন আবদুল্লাহ সান ডিয়েগো কাউন্টির বৃহত্তম ওই মসজিদের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। হামলাকারীদের গুলিতে সেদিন যে তিন ব্যক্তি নিহত হন, তাঁদের একজন তিনি। পরে হামলাকারী দুই কিশোরও আত্মহত্যা করে।
সান ডিয়েগোর পুলিশপ্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে আমিনকে নিয়ে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে তাঁর কাজ ছিল বীরত্বপূর্ণ। আজ তাঁর অসামান্য সাহসিকতার কারণেই অনেক প্রাণ বেঁচে গেছে।’
আমিন আবদুল্লাহর সাবেক একজন সহকর্মী কাশিফ উল হুদা। তিনি আল-জাজিরায় আমিনের বীরত্বের ও তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণা করেন। তাঁর সেই লেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো:
আমিনের এমন বীরত্বে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ, মানুষটাকে আমি চিনতাম। তিনি ছিলেন আমার সহকর্মী। সব সময় অন্যকে আগলে রাখার মনোভাব ছিল তাঁর। আমার জীবনের অন্যতম অন্ধকার একটি দিনে এ মানুষটাই আমার বিষণ্ন মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন।
ঘটনাটা গত বছরের ডিসেম্বরের। হাজারো দুশ্চিন্তা নিয়ে বাবার জানাজায় অংশ নিতে গিয়েছিলাম সান ডিয়েগোর এ ইসলামিক সেন্টারে। ১৯৯৫ সালে ভারত থেকে আমাদের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। এখানেই আমার পড়াশোনা, কর্মজীবন। আজ আমি এক কন্যার বাবা।
সেদিন এ দেশের মাটিতেই আমি বাবাকে দাফন করেছিলাম। এর মাধ্যমে আমার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এ দেশের সঙ্গে গেঁথে যায়। এ দেশেই আমি আমার জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছি।
একজন মুসলমান হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্থান দেখেছি। আবার ১৯৯০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষ ও সহিংসতাও বাড়তে দেখেছি।
শেষবার আমি ‘ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো’–তে বেশ কয়েক বছর পর গিয়েছি। সেবার খেয়াল করলাম, মূল ভবনের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। হাইওয়ে থেকে মসজিদের সুন্দর মিনার আর গম্বুজ এখনো স্পষ্ট দেখা যায়। ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক স্থাপত্যের এই মিশ্রণই এখানে মুসলিমদের উপস্থিতির জানান দেয়।
তবে মসজিদের ফটকে ভারী অস্ত্রসহ একজন নিরাপত্তারক্ষীর উপস্থিতি আমাকে অবাক করল। আমি ভাবলাম, এটি একেবারে নতুন কিছু। সান ডিয়েগোর বিভিন্ন মসজিদ লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক বার্তা আসত। কিন্তু আমরা কোনো বিপদে পড়তে পারি, এমনটা কখনো ভাবিনি। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমাদের কি প্রকৃতই এত কড়া নিরাপত্তার দরকার আছে?’
ওই নিরাপত্তারক্ষীর মুখ আমার চেনা মনে হলো। কাছে যেতেই তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, “কাশিফ ভাই!!!”। এরপর আমি আমিনের সেই প্রশস্ত হাসিটা দেখলাম।
আমরা আগে একটি ডেন্টাল অফিসে একসঙ্গে কাজ করতাম। আমি তাঁর ব্যবস্থাপক ছিলাম। ডেন্টাল কাজে তিনি খুব একটা দক্ষ ছিলেন না। কিন্তু যে মানুষ সব সময় হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানায়, তাঁকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া খুব কঠিন। তাই তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিদের প্রতি আমিন আবদুল্লাহর সব সময় একধরনের মুগ্ধতা ছিল। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনলেই তিনি ডেন্টাল অফিস থেকে বাইরে দৌড়ে যেতেন।
আমি পড়াশোনা শেষে সান ডিয়েগো ছেড়ে যাই। বায়োটেক পেশায় ক্যারিয়ার শুরু করি। তবে আমার মা-বাবা আর ভাইবোনেরা সেখানেই থেকে যান। আমি প্রায়ই ওখানে যেতাম। কিন্তু সেই দিনের আগে আমিনের সঙ্গে আর দেখা হয়নি।
আমিন আবদুল্লাহ সিকিউরিটি অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন দেখে খুব ভালো লাগল। বাবার জানাজার সেই কঠিন দিনেও আমরা কিছুটা আনন্দের স্মৃতি ভাগাভাগি করলাম। একে অপরের জীবনের খোঁজখবর নিলাম। প্রায় ২০ বছর পর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। সেটিই ছিল আমাদের শেষ দেখা।
গতকাল মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে আমিন আবদুল্লাহ শহীদ হয়েছেন। ‘আমিন’ নামের অর্থ ‘বিশ্বস্ত’। তিনি নিজের নামের মর্যাদা রেখেছেন। যা ভালোবাসতেন, তা করতে গিয়েই প্রাণ দিয়েছেন।
আমিন একজন আফ্রিকান আমেরিকান মায়ের ঘরে জন্মেছিলেন। তিনি যেমন একজন খাঁটি আমেরিকান ছিলেন, তেমন ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম। দুই আমেরিকান তরুণের চালানো গুলিতেই আজ তাঁকে প্রাণ দিতে হলো।
সৌজন্যে : প্রথম আলো