সিলেটে স্বামী উপপরিচালক ক্ষমতার কেন্দ্রে স্ত্রী!

কাগজ-কলমে মো. নিয়াজুর রহমান সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি)। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দপ্তরের মূল হর্তাকর্তা এখন তার দ্বিতীয় স্ত্রী সদর উপজেলার মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ডা. সুবর্ণা রায় তুলি! ভিন্ন ধর্মের এই দম্পতির ব্যক্তিগত প্রভাব ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটে মুখ থুবড়ে পড়েছে জেলার পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ।
স্বামী-স্ত্রীর এই সিন্ডিকেট আর লাগামহীন দুর্নীতির কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ। পোস্টিং, বদলি, পদায়ন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত নিতে এখন স্ত্রীর অনুমতিই শেষ কথা। ফলে পুরো দপ্তরে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিনাত রেহানা বলেন, উপ-পরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান ও সুবর্ণা রায় তুলির বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ সহ্য করবে না সরকার।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জেলার ‘অঘোষিত ডিডি’ হিসাবে ক্ষমতার রশি ধরে রেখেছেন নিয়াজুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী ডা. সুবর্ণা রায় তুলি। সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে প্রবেশ করলেই যে কেউ এক অদ্ভুত প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন। দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ডিডি নিয়াজুর রহমান প্রশাসনিক প্রধান হলেও, সব ফাইলে শেষ সিদ্ধান্ত আসে তার দ্বিতীয় স্ত্রী ডা. সুবর্ণা রায় তুলির টেবিল থেকে। ডিডি স্বামীর ক্ষমতা অপব্যবহার করে তিনি অধীনস্থদের কারণে-অকারণে শোকজ করে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। ফলে জেলার সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে চরম আতঙ্কের সঙ্গে সমীহ করে চলেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, একজন মেডিকেল অফিসার হিসাবে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ, চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি যেমন-আইইউডি, ইমপ্লান্ট সংক্রান্ত সেবা প্রদান বা তদারকি করার কথা থাকলেও ডা. তুলি নিজ দায়িত্বের ধারেকাছেও যান না। বরং সেবাদানকারীরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসাবে তার কাছে পরামর্শ বা সাহায্য চাইতে গেলে তিনি চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন। তার দপ্তরে সেবাদানের চেয়ে শোকজ করার সংখ্যা বেশি। দপ্তরে নিজের অনুপস্থিতি ও অনিয়ম ঢাকতে কথায় কথায় শোকজ করে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘শোকজ তুলি’ নামে। সম্প্রতি তার এই অনিয়ম ও অনুপস্থিতি ধামাচাপা দিতে জেলার শাহপরাণ থানাধীন সদর উপজেলার অফিসটিকে জোরপূর্বক জেলা কার্যালয়ের তৃতীয়তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস (২০২৬) উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য ডা. তুলির পছন্দের লোকদের নির্বাচিত করা হয়। গত ১২ জুলাই তাদের সম্মাননা দেওয়া হয়। এমনকি আট মাস ধরে অসুস্থ একজন পরিবারকল্যাণ সহকারীকে (এফডব্লিউভি) উপজেলার শ্রেষ্ঠ কর্মী ঘোষণা করা হয়।
অফিসে অনুপস্থিতির রেকর্ড : ডা. সুবর্ণা রায় তুলির নিয়মিত অফিস না করার বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। গত ছয় মাসের (ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬) তার অফিসে উপস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই সময়ে তিনি মাত্র ৩৩ দিন অফিস করেছেন। এছাড়া তিন দিন ডিডি অফিস এবং ছয় দিন মাঠ পরিদর্শনে অংশ নিয়েছেন। বাকি দিনগুলোতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও তিনি দিব্যি সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। এসব অনিয়ম দেখভাল যে কর্মকর্তা করেন (ডিডি) তিনি তার চতুর্থ স্বামী। অথচ নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন না করেই স্বামী-স্ত্রী উভয়েই প্রতি মাসে ভুয়া টিএ (ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স) বিল দাখিল করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও সরকারি ব্যয় হ্রাসের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও ডা. সুবর্ণা রায় তুলি তার ব্যক্তিগত বাজারঘাট, শপিংমল কিংবা রেস্তোরাঁয় যাতায়াতের জন্য নিয়মিত স্বামীর সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। এছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সেবাগ্রহীতাদের জন্য বরাদ্দকৃত যাতায়াত ভাতাও এই দম্পতি আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বদলি বাণিজ্য ও লেনদেন : সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে পোস্টিং, বদলি এবং নিয়োগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে পোস্টিং বা নিয়োগ দেওয়া হয়। রেকর্ডিংয়ে এই লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় কয়েকজন এই লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন। সরকারি বিধিমালা (বিশেষ করে মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া এফডব্লিউএ বদলির নিষেধাজ্ঞা) উপেক্ষা করে উপ-পরিচালক স্বামীর মাধ্যমে ঘুসের বিনিময়ে বিভিন্ন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার দুজন এফডব্লিউএ লরিমা বেগম ও শিরিনা আক্তার বদলির জন্য ডা. সুবর্ণা রায় তুলিকে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে ঘুস দেন। পরবর্তীতে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আসায় এবং বিভাগীয় পরিচালকের হস্তক্ষেপে অন্য কর্মচারীদের বদলি আটকে গেলে লেনদেন করা চার লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন তারা। এছাড়া পছন্দের কর্মচারীদের দিয়ে কাজ না হলে তাদের শোকজ করা এবং টাকা নিয়ে পছন্দের অযোগ্যদের পোস্টিং দেওয়ার একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই দম্পতি।

সবখানেই ডা. তুলির ঔদ্ধত্য : ডা. সুবর্ণা রায় তুলির বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস নতুন নয়। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় মেডিকেল অফিসার হিসাবে কর্মরত থাকাকালীন তার অন্যায় ও নানাবিধ অনিয়মে অতিষ্ঠ হয়ে কর্মচারীরা ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। হবিগঞ্জ জেলার তৎকালীন উপ-পরিচালক মীর সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ডা. তুলির বিরুদ্ধে বিভাগ পরিচালনায় অদক্ষতা, রোগীর সঙ্গে খারাপ আচরণ, ওটি ব্যবস্থাপনায় অশালীন ব্যবহার এবং উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের সত্যতা পেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু স্বামী ডিডি নিয়াজুর রহমানের প্রশাসনিক প্রভাব এবং উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপে সেই তদন্তের ভিত্তিতে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উলটো যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, শোকজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ প্রচার চালিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে।

ডিডির নৈতিক স্খলন ও ক্ষমতার অপব্যবহার : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসা মো. নিয়াজুর রহমান এই দপ্তরে এক আতঙ্কের নাম। এর আগে ময়মনসিংহ ও বরিশালসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে নারী কেলেঙ্কারি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ডা. সুবর্ণা রায় তুলির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জেরে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন নিয়াজুর রহমান। প্রথম স্ত্রী-সন্তানের আপত্তি ও বাধার কারণে প্রথমে তুলিকে বিয়ে করতে রাজি হননি তিনি। পরে মহাপরিচালকের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন ডা. তুলি। একপর্যায়ে বরখাস্ত বা চাকরি হারানোর মুখে পড়েন এই কর্মকর্তা। এরপর বাধ্য হয়ে বিয়ে করেন তাকে। এ ঘটনার পর তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়।

নিয়াজুর রহমানের নৈতিক স্খলনের দায়ে তাকে অধিদপ্তর থেকে বরিশাল বিভাগে এবং পরবর্তীতে নরসিংদীতে ডিমোশন দিয়ে বদলি করা হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর প্রভাবে তিনি সিলেটে পোস্টিং নেন। স্বামীর এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে ডা. তুলি এখন পুরো জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো পরিচালনা করছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফ্রিজ তুলির অফিসে : সিলেট সদর জালালাবাদ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে জরুরি ঔষধ ও ইনজেকশন রাখার জন্য একটি ফ্রিজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ডা. সুর্বণা এই ফ্রিজ ওই কেন্দ্রে না দিয়ে নিজ অফিসে ব্যবহারের জন্য নিয়ে আসেন।
সাধারণ কর্মী ও সচেতন মহলের ক্ষোভ : দম্পতির এই ব্যক্তিগত প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সিলেটের পরিবার-পরিকল্পনা দপ্তরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। জুনিয়র কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সবসময় তটস্থ থাকেন কখন কার কপালে শোকজ বা বদলির খড়গ নেমে আসে। অথচ সব প্রমাণ ও তদন্ত প্রতিবেদন থাকার পরও অদৃশ্য শক্তির বলে এই স্বামী-স্ত্রী বহালতবিয়তে থেকে একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে গত তিন ধরে চেষ্টা করেও উপ-পরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান ও তার স্ত্রী সুর্বণা রায় তুলির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার সরেজমিন সিলেট সাপ্লাই রোডের পরিবার পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর তিন দিন ধরে তার সরকারি ও ব্যক্তিগত দুটি মোবাইল নম্বরেই কল করা হয়। শনিবার দুপুরে একবার তিনি সরকারি ফোনটি রিসিভ করেন। কিন্তু প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়েই তিনি মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এদিকে ডা. সুবর্ণা রায় তুলির কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় দিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।

একপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সিলেটের পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সহযোগিতা চাওয়া হয়। অনেকক্ষণ পর তিনি প্রতিবেদককে জানান, ‘কথা বলার জন্য আপনার ভিজিটিং কার্ড তাকে পাঠিয়েছে। ফোনও দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার ফোনটিও রিসিভ করেননি মো. নিয়াজুর রহমান।’

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:০৪
  • ১২:০২
  • ৪:৩৫
  • ৬:৩৬
  • ৭:৫৫
  • ৫:২৩