মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলারে। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। এ তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।

মোট অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। তবে মাথাপিছু জিডিপি হিসাব করা হয় একটি দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবেও বিবেচিত।

তবে মাথাপিছু জিডিপিতে সম্ভাব্য এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিতে ভারত এগিয়ে থাকতে পারে।

এ ছাড়া মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় হিসাব করলে ভারতের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে দুই দেশের মাথাপিছু জিডিপির অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। ২০২৯ সালের দিকে ভারত আবারও এই সূচকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস। অন্যদিকে, প্রযুক্তি, বড় সেবা খাত, শিল্প এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বেশি বৈচিত্র্যময়।

বৈশ্বিক পরিস্থিতিও দুই দেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ জ্বালানির চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে মাথাপিছু জিডিপিকে একটি দেশের মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার একমাত্র নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটি গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাব তুলে ধরে; কিন্তু দেশের সম্পদ ও আয়ের বণ্টন, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান, কর্মসংস্থানের মান কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সরাসরি প্রকাশ করে না।

তাই মাথাপিছু জিডিপিতে সম্ভাব্য অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য কমানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাই হবে এই অগ্রগতিকে মানুষের জীবনে কার্যকর করে তোলার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *