প্রবাসের মাটিতে শেকড়ের গল্প , নিউইয়র্কে এ যেন এক অনন্য আয়োজন । নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও কিছু বিকেল আলাদা হয়ে থাকে – স্মৃতি, সংস্কৃতি আর মানুষের টানে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার তেমনই এক রোদেলা বিকেলে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল “সাপ্তাহিক ঠিকানা” অফিসের পরিসর, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছিল এক আন্তরিক আড্ডা-আলোচনা।

দেশের সীমানা পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই ক্ষুদ্র বাংলাদেশ যেন আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছিল নিজের শেকড়ের গন্ধ। আয়োজনে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আসমা আহমেদ ও লেখক শিলা মোস্তফা – দু’জন ভিন্ন পরিসরের মানুষ, কিন্তু একই সুতায় গাঁথা তাদের ভাবনা, সংস্কৃতি আর দায়বোধে।

আড্ডায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আসমা আহমেদ ফিরে গেলেন তাঁর শৈশবে। তিনি স্মরণ করলেন তাঁর পিতা, বাংলা ভাষার প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের অভিনেতা ইনাম আহমেদকে। সিলেটের আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও বাবার কঠোর অনুশাসনে শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলা ও পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠার গল্পটি যেন উপস্থিত সবাইকে ছুঁয়ে যায়। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সহজ অথচ গভীর একটি সত্য – যেখানেই থাকি, নিজের মানুষ আর সংস্কৃতির সাথে সংযোগই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আরো যুক্ত করেন এখনো যদি কেউ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের জন্য সহযোগিতা চান তিনি তাদের সাহায্য করবেন।
লেখক শিলা মোস্তফা তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন প্রবাস জীবনের নানা অভিজ্ঞতা এবং লেখালেখির পথচলা। তিনি বলেন, আসমা আহমেদের মতো ব্যক্তিত্বরা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নারীদের অগ্রযাত্রায় অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন।

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন, স্বল্প সমের নোটিশে সংবাদ মাধ্যম ব্যক্তিত্ব আসমা আহমেদ এবং লেখিকা শিলা মোস্তফাকে নিয়ে এ আড্ডা আয়োজন সম্ভব করার জন্য ঠিকানা সম্পাদক এম এম শহীনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আসমা আহমেদ এবং শিলা মোস্তফার কর্মময় জীবন এবং সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায় তাদের প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করেন।

বাংলা পত্রিকা ও টাইম টিভির সিইও আবু তাহের তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করেন সেই সময়কে, যখন বাংলাদেশে একমাত্র টেলিভিশনের যুগে আসমা আহমেদের উপস্থিতি ছিল পেশাদারিত্বের এক অনন্য মানদণ্ড। তাঁর ভাষায়, “আমরা যারা সিলেট অঞ্চলে বড় হয়েছি, আসমা আহমেদের নাম শুনেই বড় হয়েছি।”
আড্ডার আবহকে আরও সুরম্য করে তোলেন শিল্পী জাকির হোসেন, যিনি জীবনের গান শোনান উপস্থিতদের। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন নাট্যশিল্পী ইজাজ আহমেদ, যার উপস্থিতি আড্ডায় এনে দেয় নাট্যভাষার এক আলাদা আবহ।

এম এম শাহীন আহমেদের আন্তরিক আপ্যায়নে চা, সিঙারা, সমুচা আর ফুকু চৌধুরীর আনা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পান যেন আড্ডার স্বাদকে আরও গভীর করে তোলে। লেখক সাংবাদিক রহমান মাহবুব, শেলী জামান খান, ফরিদা ইয়াসমিন, সৈয়দ মাসুদুল কবির, আবৃত্তিশিল্পী আবীর আলমগীর, ড. রফিকুল ইসলাম, রাশিদা আখতার, লেখিকা শেলি জামান খান, ফরিদা ইয়াসমিন, ডা. প্রতাপ দাশসহ আরও অনেক বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়েছে, কিন্তু আড্ডার উষ্ণতা থেকে গেছে সবার মনে। প্রবাসের মাটিতে এমন আয়োজন যেন নিজের শেকড়কে ছুঁয়ে থাকার এক নীরব অঙ্গীকার, যেখানে মানুষ, স্মৃতি আর সংস্কৃতি একসূত্রে বাঁধা পড়ে নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *