একীভূত হতে যাচ্ছে এনসিপি-এবি পার্টি? এনসিপি ও এবি পার্টির লোগো

ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হলেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) মধ্যে আদর্শগত মিল রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে ১১ দলের বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হয়েছে দুই দলই। একই জোটে থাকলেও এবি পার্টির একাধিক নেতা সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন, আরও কয়েকজন ‘পাইপলাইনে’ আছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গুঞ্জন উঠেছে, দল দুটি একীভূত হতে যাচ্ছে। বিষয়টিকে নাকচ না করলেও এই প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি দুই দলের শীর্ষ নেতাদের কেউই।

অপেক্ষাকৃত এবি পার্টি প্রতিষ্ঠার অনেক পরে যাত্রা শুরু করলেও গত নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপি। শাপলা কলি প্রতীকে ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টিতে জয় তুলে নিয়েছে দলটি। আসনের আনুপাতিক হারে একটি সংরক্ষিত নারী আসনও পেয়েছে তারা। সেইসঙ্গে জোটসঙ্গী জামায়াতের পক্ষ থেকেও ছাড় পেয়েছে একটিতে। সব মিলিয়ে সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনের পর দলটির আসন হতে যাচ্ছে আটটি।

অন্যদিকে জোট থেকে ছাড় পাওয়া তিনটি আসনের মধ্যে একটিতেও জিততে পারেনি সাবেক শিবির নেতাদের দল এবি পার্টি। তাই নির্বাচনের পরপরই দলটি সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে এক ধরনের আলোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দলটি থেকে বেশ কয়েকজন নেতা এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। এবি পার্টিসহ বিভিন্ন দলের আরও কয়েকজন পাইপলাইনে আছেন বলেও জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গত ১৯ এপ্রিল কয়েকজন নেতার যোগদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব তথ্য জানান।

রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যদি এবি পার্টির শীর্ষ নেতাদের আরও কেউ এনসিপিতে যোগ দেন, তাহলে দলটির হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত কী করবে, তারা শেষ পর্যন্ত কি দল বিলুপ্ত করে এক প্ল্যাটফর্মে উঠে যাবেন? এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি-এবি পার্টি একীভূত হতে যাচ্ছে বলেও গুঞ্জণ উঠেছে।

যদি এই গুঞ্জন সত্য হয়ও, তাহলে একীভূত হবে কোন প্রক্রিয়ায়, আর এ ধরনের আলোচনার ভিত্তি কতটুকু? জানতে চাইলে দুই দলের নেতারা এ নিয়ে জোরালো কিছু বলতে পারেননি। কেউ বলছেন, আপাতত ‘সম্ভাবনা নেই’, আবার কারও দাবি ‘আলোচনা চলছে, সময়ের ব্যবধানে তা খোলাসা হবে’।

এ বিষয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া  বলেন, ‘দুই দলের আদর্শগত কিছুটা মিল রয়েছে। তাই অনেকে এই দুই দলের একীভূত হওয়া নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। তবে আমরা আপাতত নিজেদের দল নিয়েই থাকতে চাই। এক্ষেত্রে আমরা নতুন উদ্যোমে এগিয়ে যেতে চাই।’

হঠাৎ কেন এমন আলোচনা

প্রায় সমসাময়িককালে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এসসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), গণঅধিকার পরিষদ ও ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ); এই চার দলের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ ছাড়া বাকি তিনটি দলের কিছু নেতার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। এর মধ্যে আপ বাংলাদেশের নিবন্ধন নেই।

এই দলগুলোর দর্শনও ঘুরেফিরেই একই, তাদের নেতৃত্বও তারুণ্যনির্ভর। তাই গত নির্বাচনের আগেও নিবন্ধনভুক্ত তিন দল এনসিপি, এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের এক হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একরকম চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল। তবে নেতৃত্বের ব্যাপারে একমত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। গণঅধিকার পরিষদ বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে থাকায় তাদের নিয়ে নিয়ে কোনও আলোচনা নেই।

গত ১৯ এপ্রিল এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের হাতে ফুল দিয়ে দলটিতে যোগদান করেন এবি পার্টি ও আপ বাংলাদেশের শীর্ষ কয়েক জন নেতা। এর মধ্যে রয়েছেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার সানী আবদুল হক, আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত ও মুখপাত্র শাহরীন ইরা।

এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম, দফতর সম্পাদক শাহাদাত হোসেনও যোগ দেন এনসিপিতে।

এর আগেও এবি পার্টির কয়েকজন নেতা এনসিপিতে যুক্ত হয়েছেন। দুই দলের একীভূত হওয়ার বিষয়টিতে সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করলে দুই দলের নেতারাই কিছুটা ‘উদার’ মন্তব্য করেছেন। এ কারণেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে।

কীভাবে চলছে এবি পার্টি

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি থেকে সবশেষ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হন। পরবর্তীকালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা’র সদস্য হয়েছিলেন। তবে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর একাত্তরে দলের ভূমিকা নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিলে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে বহিষ্কার করা হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নামে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। সেখানে সাবেক শিবিরের অনেকেই যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ২ মে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) গঠন করেন। এতে শুরুতে আহ্বায়ক জামায়াতের সাবেক নেতা সোলায়মান চৌধুরী ও সদস্য সচিব হন মজিবুর রহমান মঞ্জু। তবে প্রথম কাউন্সিলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মজিবুর রহমান মঞ্জু, আর সাধারণ সম্পাদক হন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। এতে দলের থিংক ট্যাংক হিসেবে উপদেষ্টা বানানো হয় লন্ডনপ্রবাসী ও জামায়াত থেকে পদত্যাগ করা সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাজুল ইসলামকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। তার স্থলে সাধারণ সম্পাদক হন ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। আর ৫ আগস্টের পরপরই এবি পার্টি থেকে জামায়াতে ফিরে যান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও সোলায়মান চৌধুরী। এই তিন শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে কিছুটা শূন্যতা তৈরি হয়। এরই মধ্যে কিছু তৃণমূল নেতাকর্মীও সাবেক দল জামায়াতেই ফিরে গেছেন। আর নির্বাচনেও দলের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদকসহ কেউই জিততে পারেননি। এসব কারণে বর্তমান দল নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক শীর্ষ নেতা স্বীকার করেছেন।

কোন কৌশলে এগোচ্ছে এনসিপি

অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরাই প্রতিষ্ঠা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে কার্যক্রম শুরু করে তারা। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেন তারা। শুরুতেই এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব হন আখতার হোসেন। তারাসহ বেশিরভাগ নেতাই জুলাইয়ের সম্মুখ সারির নেতা। এতে যুক্ত হন বিভিন্ন পেশাজীবী ও ভিন্ন দলের নেতারা।

দেশব্যাপী গণপদযাত্রাসহ সমসাময়িক ইস্যুতে কর্মসূচির কারণে আলোচিত হয় দলটি। এতে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও দলে যোগ দেন। এর বাইরেও দৃশ্যমান বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করে দলটি। এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন লাভ করে তারা। নির্বাচনের আগে প্রথমে ‘একলা চলো’ নীতি অবলম্বন করলেও কখনও জামায়াত আর কখনও বিএনপির সঙ্গে জোট করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তারা জামায়াতের বন্দরেই ভেড়ে। অবশ্য নতুন দল হিসেবে প্রথম নির্বাচনেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায় দলটি। সেই সাফল্যকে সামনে রেখেই তারা দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, একটি উদারপন্থি দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায় এনসিপি। এরই আলোকে বিভিন্ন পরিচিত মুখকে দলে আনার টার্গেটে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াতের ‘বঞ্চিত’ নেতাদের পেছনে সময় দিচ্ছেন কিছু নেতা। আর আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকেও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে নিচ্ছেন নেতারা। এমনটিই জানিয়েছে সূত্রটি।

একীভূত হওয়ার পথ কত দূর

এনসিপি ও এবি পার্টির একত্রিত হওয়ার গুঞ্জন চললেও নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, দুই দলের আদর্শগত মিল আছে, সেকারণে তাদের মধ্যে সুসম্পর্কও রয়েছে। তাছাড়া দুই দলই জুলাইয়ের শক্তি। তাই রাজনৈতিক ঐক্য হতেই পারে৷ তবে এখনই ‘একাকার’ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন  বলেন, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল থেকে অনেকেই আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। পাইপলাইনে আছেন বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদরা। আমাদের দল দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এবি পার্টির আমাদের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে এর বাস্তবায়ন দেখতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।  তিনি বলেন, এবি পার্টি এক ধরনের পরিবর্তনের রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা করেছে। তিনি জানান, তারা তাদের দলীয় কাজ করছেন। দল তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। এনসিপির সঙ্গে একীভূত হওয়ার আলোচনা তিনিও শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৯
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৫
  • ৬:২৫
  • ৭:৪৪
  • ৫:১৮