সিলেটে উধাও আড়াইশ পুকুর! সিলেটের বিখ্যাত মাছুদিঘী। ছবি : সংগৃহীত

এক সময় যে শহর পরিচিত ছিল ‘দীঘির শহর’ নামে, সেই সিলেট আজ রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতার নগরীতে। গত তিন দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ব্যবসার বিস্তার এবং দখল-দূষণের কারণে সিলেট মহানগর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় দুই শতাধিক ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও দীঘি। পরিবেশবাদী সংগঠন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) এবং স্থানীয় প্রবীণদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩০ বছরে সিলেট মহানগর তার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৯৯০-এর দশকে সিলেট শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি পুকুর ও দীঘি ছিল। অথচ বর্তমানে সিসিকের সরকারি হিসাবে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮টিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র জরিপে টিকে থাকা পুকুর ও দীঘির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৩৬টি। অবশ্য সিসিকে নতুন যুক্ত হওয়া ১৫টি ওয়ার্ডের হিসাব ধরলে এই সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।

গবেষণা অনুযায়ী, সিলেট নগরের ৭৯.৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ছড়া-খাল ও পুকুর-দীঘি মিলিয়ে জলাভূমির পরিমাণ মাত্র ৫.৪৯ বর্গকিলোমিটার, যা মোট আয়তনের মাত্র ৬.৯১ শতাংশ। অথচ একটি আদর্শ নগরে অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ জলাভূমি থাকা প্রয়োজন।

পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-র সদস্য সচিব আবদুল করিম কিম বলেন, “বিগত শতাব্দী পর্যন্ত সিলেট পৌরশহর ছিল। ২০০২ সালে এটি নগরীতে রূপান্তরের পর শুরু হয় অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সবুজ টিলা কাটার মাটি দিয়ে ভরাট হতে থাকে পুকুর-দীঘি ও জলাশয়। লামাবাজার-বিলপাড়ের মুক্তার বিল বা কাজল হাওরের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। লালদীঘির পাড়, সাগরদীঘির পাড়, রামের দীঘির পাড়, চারাদীঘির পাড় কিংবা মাছুদীঘির পাড়—এসব নাম ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করলেও বাস্তবে অধিকাংশ দীঘির অস্তিত্ব এখন আর নেই।”

স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতেও উঠে এসেছে এই করুণ চিত্র। নগরের দাঁড়িয়েপাড়ার বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সী আবদুল মজিদ জানান, একসময় তাদের এলাকায় প্রায় ৪৮টি ছোট-বড় পুকুর ছিল, যা ছিল পানির প্রধান উৎস। যুগ বদলানোর সাথে সাথে সেই পুকুরগুলো ভরাট করে গড়ে উঠেছে দালানকোঠা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৫ সালের পর থেকে সিলেটে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে আবাসন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে। জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি-মালিকানাধীন পুকুর ও দীঘি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণকে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এমনকি রাস্তা প্রশস্তকরণ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের নামে কাজীদীঘিসহ বহু পুকুর ও দীঘির ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অংশ ভরাট করার অভিযোগ রয়েছে।

পুকুর ও জলাশয় ধ্বংসের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। পরিবেশকর্মী এবং বেলার মতে, সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরের জিন্দাবাজার, সুবিদবাজার, উপশহরের মতো এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ এই প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জহির বিন আলম বলেন, “দীঘি বা পুকুর একটা নগরের রিজার্ভার (জলাধার) হিসেবে কাজ করে। মানবদেহ যেমন পেট ছাড়া চিন্তা করা যায় না, তেমনি পুকুর ছাড়া একটি নগরও চিন্তা করা যায় না। জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের জন্য বেদখল হওয়া জলাশয় পুনরুদ্ধার ও বিদ্যমানগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।”

আইনগতভাবে বাংলাদেশে পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’, ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’ এবং সর্বশেষ ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া জলাশয় ভরাট করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

জলাশয় রক্ষায় ২০২০ সালে সিসিক একটি বিশেষ কমিটি গঠন করলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারির অভাবে তালিকাভুক্ত অনেক জলাশয়ও পুনরায় ভরাটের শিকার হয়েছে। এছাড়া তেররতন এলাকার প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো দীঘি কিংবা গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ জমিদার পুকুরের মতো অনেক জলাশয়ের মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানান, বর্ধিত নতুন ওয়ার্ডগুলোতে অনেক পুকুর রয়েছে। নগর উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় এগুলোর তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে মাঠে টিম কাজ করছে এবং শীঘ্রই রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিবেশবাদীদের দাবি, সিলেটকে নিশ্চিত পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে শুধু কমিটি গঠন নয়, বরং অবশিষ্ট জলাশয়গুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং, সীমানা নির্ধারণ এবং কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৩৮
  • ১১:৫৫
  • ৪:৩০
  • ৬:৪১
  • ৮:০৭
  • ৫:০৪