মেশিনের সাহায্যে খোজার খলার (মোযা পুকুর) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালায় সিসিক। ছবি : সিসিক

এক সময় যে শহর পরিচিত ছিল ‘দীঘির শহর’ নামে, সেই শহরে এখন দিঘী নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ব্যবসার বিস্তার এবং দখল-দূষণের কারণে সিলেট মহানগর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় দুই শতাধিক ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও দীঘি। গত ৩০ বছরে সিলেট মহানগর তার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি। যেগুলো আছে, সেগুলোও মৃতপ্রায়। বেশিরভাগ পুকুরই ময়লার স্তুপ, কচুরিপনা ও জমাট বাঁধা কালচে পানির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সেই পুকুরগুলো পুনরুদ্ধারে মাঠে নেমেছে সিলেট সিটি করপোরেশন।

দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত, আবর্জনাময় ও কচুরিপানায় ঢাকা জলাশয়কে তার অতীত ঐতিহ্য ও হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে সরেজমিনে তদারকি করছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

নগরীর পরিত্যক্ত ও দখল হওয়া সব জলাশয় উদ্ধার করে সেগুলোকে পরিবেশবান্ধব রূপ দেওয়া এবং জনকল্যাণে কাজে লাগানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন সিসিক প্রশাসক। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ঘাসিটুলা সংলগ্ন বিশাল এই জলাশয় উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। রোববার (২ আগস্ট) সকালে নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাসিটুলা কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিচ্ছন্নতা ও জলাশয় উদ্ধার অভিযানের উদ্বোধন করেন সিসিক প্রশাসক।

প্রায় ২০০ শতক জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল। চারপাশ আগাছা, জমাট ময়লা-আবর্জনা আর কচুরিপানায় ঢেকে যাওয়ায় একসময়ের নান্দনিক এই জলাশয়টি এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দূষিত পানি ও আবর্জনার দুর্গন্ধের পাশাপাশি পুরো এলাকা মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়। অথচ স্থানীয়রা জানান, একসময় শীতকাল এলেই এই দিঘিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত থাকত। পরিবেশ দূষণ ও অযত্নে আজ হারিয়ে যেতে বসেছিল সেই চিরচেনা রূপ।

এর আগে ২০ জুলাই নগরীর ২৫ নং ওয়ার্ডের খোজার খলার মোজা পুকুর পুনরুদ্ধার অভিযান চালায় সিসিক। সেটিও  ময়লার স্তুপ, কচুরিপনা ও জমাট বাঁধা কালচে পানির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল।

আরও পড়ুন

সিলেটে উধাও আড়াইশ পুকুর!

কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “একসময় সিলেট নগরীতে প্রচুর দিঘি, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন উপকারে আসার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করত। আমরা চাই জলাশয়গুলো যথাসম্ভব পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। কদিন আগেও আমরা নগরীর আরেকটি পুকুর উদ্ধারের কাজ শুরু করেছি।”

উদ্ধারকৃত ঘাসিটুলার এই পুকুরটিকে ঘিরে এলাকাবাসীর জন্য দৃষ্টিনন্দন বিনোদন ও পরিবেশবান্ধব স্পট তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “পুকুরটি পুরোপুরি পরিষ্কারের পর এর চারপাশ দিয়ে আকর্ষণীয় ওয়াকওয়ে ও সুরক্ষা রেলিং স্থাপন করা হবে। এতে একদিকে যেমন এলাকার নান্দনিকতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে নগরবাসী সকাল-সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাহাঁটি ও নির্মল বাতাস উপভোগ করতে পারবেন। আশা করছি, পরিবেশ ফিরে পেলে শীতকালে এখানে আবারও অতিথি পাখির আগমন ঘটবে।”

তবে জলাশয় কেবল সরকারি উদ্যোগে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় উল্লেখ করে সিসিক প্রশাসক স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “নিজের বাড়ির মতো করে এই জলাশয়ের যত্ন নিতে হবে। এখানে যেন নতুন করে কেউ ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য ফেলতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জলাশয় রক্ষা কেবল সরকারের একা নয়, এটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।”

উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, সিসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল হক, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন, ঘাসিটুলা পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সাইদুর রহমান বুদুরী, ১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমদ, শামীম আহমদ লোকমান, জালাল উদ্দীন শামীম, সাইদুর রহমান জিবীব, আবুল কালাম আজাদ, নাসির উদ্দিন রব, জয়নুল হক, আনছার উদ্দিন, আফতাব আহমদ, রিয়াজ উদ্দিন, জিলাল উদ্দিন ও কুটির মিয়াসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ সাধারণ জনগণ।

নগরীর পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য নিরাপদ সিলেট গড়ার লক্ষ্যে সিসিকের এই কার্যকর ও দৃষ্টিনন্দন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *