সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ২০১১ সালে যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ এবং এক যাত্রী নিহতের ঘটনায় দায়েরকৃত বহুল আলোচিত মামলায় খালাস পেয়েছেন বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম. ইলিয়াস আলীসহ দলের ৩৮ জন নেতাকর্মী। দীর্ঘ ১৫ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত (মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল)-এর বিচারক মো. শরিফুল ইসলাম এই রায় ঘোষণা করেন।

সাক্ষ্য-প্রমাণ ও দীর্ঘ জেরা শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস প্রদান করেন।

মামলার নথী অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সরকার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের বদিকোনা এলাকায় ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’-এর একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এক বৃদ্ধ যাত্রী নিহত হন। শুরুতে পরিচয় না পাওয়ায় পুলিশ তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে।

তবে ঘটনার ১৩ দিন পর ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি জ্যোস্না আক্তার নামের এক নারী থানায় এসে দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি তার স্বামী কাজী নাছির উদ্দিন (৭০), যিনি প্রখ্যাত চিত্রনায়িকা শাবনূরের বাবা। তিনি মৃতদেহের ব্যবহৃত জুতা, ঘড়ি ও বেল্ট দেখে পরিচয় শনাক্ত করেন। এই ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

ওই মামলার আসামীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী, সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান, বিএনপি নেতা এটিএম ফয়েজ, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক, সিলেট জেলা যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শাকিল মোর্শেদ, নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কোহিনুর আহমদ ও বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম ফারুক।

আসামী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট হাসান রিপন পাটোয়ারী, অ্যাডভোকেট মসরুর চৌধুরী শওকত ও অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমদ।

মামলা সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তৎকালীন সরকার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার বদিকোনা এলাকায় হবিগঞ্জ এক্সপ্রেসের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনায় বাসের যাত্রী এক বৃদ্ধ নিহত হন। পরিচয় সনাক্ত করতে না পারায় বেওয়ারিশ হিসেবে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের হয়।

দাফনের ১৩ দিন পর ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি জ্যোস্না আক্তার নামের এক নারী এসে নিহত ওই ব্যক্তিকে নিজের স্বামী দাবি করেন। তিনি দাবি করেন ওই ব্যক্তির নাম কাজী নাসির। তিনি চিত্রনায়িকা শাবনুরের বাবা। কাজী নাসিরের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন জ্যোস্না।

জোৎস্না পুলিশকে জানিয়েছিলেন, নাসির তিনটি বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্ত্রী শাবনুরের মা। সর্বশেষ মৌলভীবাজারে স্বপ্না বেগম নামে এক জনকে বিয়ে করেন নাসির।

জোৎস্না বেগম জানান, মৌলভীবাজার ও সিলেটে একটি গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গত ১৪ ডিসেম্বর নাসির বাড়ি থেকে রওনা হন। ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের অনুষ্ঠান শেষে তিনি সিলেটে আসছিলেন।

মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে একটি হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। শুধু বিরোধী দলের রাজনীতি করার কারণেই আমাদের এ মামলায় জড়ানো হয়। আদালতের রায়ে সেটি প্রমাণ হয়েছে। এজন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।

তিনি আরও বলেন, হবিগঞ্জের বাস সমিতির দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে একটি বাসে আগুনে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনায় আমাদের ফাঁসানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর এ মামলায় খালাস পেয়েছি। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এই মামলায় আমাকে চার মাস জেল খাটতে হয়েছে। এই সময় কে ফিরিয়ে দেবে?। আমরা সরকার ও আদালতের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *