
কয়লার ধিকিধিকি আগুন আর হাতুড়ি পেটানোর টুংটাং শব্দই জানান দিচ্ছে—পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ একেবারে দোরগোড়ায়। ঈদকে সামনে রেখে সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার কামার পল্লীগুলোতে চলছে উৎসবের ব্যস্ততা। পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের প্রধান হাতিয়ার ছুরি, চাপাতি, দা, বটি, কুড়াল ও চাকু তৈরিতে এখন দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কামার শিল্পের কারিগররা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই ঈদ মৌসুমে কামারদের কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলছে কামারশালার আগুন।
ছাতক শহরের কামার পট্টির বয়োবৃদ্ধ কারিগর স্বরবিন্দু দেব (৭২) নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “আমার কাজের বয়স ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে। যখন এই পেশায় প্রথম ঢুকেছিলাম, তখন মাসিক মজুরি ছিল মাত্র ৩০ টাকা। আর এখন দিনে ১ হাজার টাকা মজুরি পেয়েও বর্তমান বাজারে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখন সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।”
উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ বাজারের ‘সুইট বেঙ্গল’-এর স্বত্বাধিকারী ও বিশিষ্ট খামারি এখলাছুর রহমান ফয়েজ বলেন, “কোরবানির ঈদ আসলে কামারদের কদর ও ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বছরের বাকি সময়টাতে তারা পর্যাপ্ত কাজ না পেয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করেন। তাই এই প্রাচীন লোকশিল্পের কারিগরদের বাঁচাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত প্রয়োজন।”
এদিকে, দা-চাপাতি ও কুড়াল ব্যবসায়ী নিপেন্দ্র দেব বাজারের বেচাকেনার পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “দোকানে নতুন সরঞ্জাম তৈরি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এখনো পুরোদমে বেচাকেনার ধুম পড়েনি। সাধারণত হাটে পশু বিক্রি শুরু হলেই আমাদের তৈরি এসব সরঞ্জামের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আশা করছি এবার ভালো ব্যবসা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে কামার শিল্পের ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। ছাতকের এই ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।