বিশ্বকাপের আগে পেলেকে জানা, দেখা আর তাঁর ভক্ত হয়ে যাওয়া! মান্না চৌধুরীর পাশে ফুটবল তারকা পেলের ছবিটি সম্পাদিত।

কাল রাতে পেলেকে দেখলাম। ফুটবলের রাজা পেলে। আমি অবশ্য তাঁকে রাজা মানতে রাজি নই। আমার কাছে ফুটবলের রাজা, সম্রাট বলতে একজনই- তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনা! তুলনায় লিওনেল মেসিও যেখানে পেছনে পড়ে যাওয়া একজন। তবে কাল রাতে আমার ঘরের টেলিভিশনে স্পোর্টস লিজেন্ডস চ্যানেলে যে পেলেকে দেখলাম, তাতে পক্ষ-বিপক্ষ ভুলে, অন্ধত্বের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আমি এডসন আরান্তোষ নাসিমেন্তো দো পেলেরও ভক্ত!

সনি টেন ২’এ রাত দেড়টায় দেখছিলাম ফিফা ফ্রেন্ডলী ম্যাচ। হঠাৎ রিমোট চেপে একটু সামনে যেতেই দেখি সিনেমার মতো কিছু একটা চলছে। যেখানে ফুটবল আছে, আবেগ, মারামারি, উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আছে। আর আছেন অবিকল পেলের মতো দেখতে এক কিশোর। ফ্রান্স- আইভরিকোষ্ট ম্যাচ তখন আমার কাছে সাধারণ কিছু। ডুব দিলাম পেলের ছোটবেলার সংগ্রামী জীবন আর মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জেতার স্মৃতি নিয়ে নির্মিত বায়োপিকে। চোখ ফেরানো কঠিন। সংগ্রাম, স্বপ্ন, আশা, হতাশা, সফলতা দেখতে দেখতে কেমনে কেটে গেল ঘন্টা দেড়েক বুঝলামই না। পাড়ার মাঠে সমবয়সীদের বিপক্ষে একটা ম্যাচ জিতলেন ছোট্র পেলে আর তাঁর দল। পেলের দলটা অদ্ভুত।

মোটাসোটা একজন, চশমা পড়া লিকলিকে আরেকজন, মেয়েদের মতো দেখতে তাঁর আরেক সতীর্থ! তাঁরা মাঠে খেলে আর মজা করে। সেই ম্যাচ জিতে এবার পেলের দলের পরীক্ষা তাঁদের চেয়ে বেশ বড়দের নিয়ে গড়া এক দল। ম্যাচ শুরুর আগে পেলেদের নিয়ে বড়দের মারাত্মক স্লেজিং, হাসাহাসি! শেষপর্যন্ত ম্যাচ শুরু হলো। বড়া এগিয়ে ছয় গোলে। এরপর শুরু হলো আসল ম্যাজিক। ছোট্ট পেলের অবিশ্বাস্য সব রিসিব, ড্রিবলিং আর ফিনিশিংয়ে ম্যাচ জিতলো তাঁর দল! কিন্তু এই ম্যাচ জেতা তাঁদের জন্য হয়ে উঠল বিপদ! মাঠ থেকে বাড়ীর পথ ধরতেই পেলেদের পেছন নিল সন্ত্রাসীরা। বুঝতে পেরে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা। দলের অন্যরা নিরাপদ স্থানে পৌছলেও চশমা পড়া বন্ধু গাছের ডালের সাথে লেগে পড়ে গেলেন। পেলে তাঁকে টেনে তুলে নিয়ে গেলেন কিছুটা দূরে, একটা গর্ত পেয়ে সেটাতে ঢুকলেন দুইজন। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। টিলার মাটি ধ্বসে মারা গেলেন পেলের সেই বন্ধু। খেলার সাথী হারিয়ে ভেঙে পড়েন কালো মানিক। পড়ালেখা, ফুটবল কিছুতেই মন বসে না তাঁর। বাবা কাঁধে হাত রেখে, স্নেহের ছায়া দিয়ে সন্তানকে বাস্তবতা বুঝালেন। স্বপ্ন দেখিয়ে সাহস জোগালেন এগিয়ে যাওয়ার। তবু কাজ হয় না। একদিন বাবা পেলেকে নিয়ে গেলেন বাড়ীর অদূরে তাঁদের বাগানে। সেখানে গাছ থেকে আম পেড়ে সেই আমকে ফুটবল বানিয়ে বাবা দেখাতে লাগলেন সব কসরত। পেলে বাবার এমন কান্ড দেখে হাসেন।

একসময় নিজেই হাতে তুলে নেন আম। বাবার মতোই আমকে বল বানিয়ে করতে থাকেন অবিশ্বাস্য সব কাজ। বন্ধু হারানোর শোক ভুলে শুরু হলো নতুন দিনের স্বপ্ন। এরই মাঝে চারদিকে নামডাক পড়ে গেছে কালো মানিকের। ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব সান্তোষ সুযোগটা নিল। অজপাড়াতে গাড়ী নিয়ে এসে হাজির সান্তোষের চেয়ারম্যান! কিন্তু পরিবারের মায়া ছেড়ে পেলে যেতে চান না দূরে। শেষপর্যন্ত বাবা- মায়ের জোরাজুরিতে লাগেজ নিয়ে ওঠেন গাড়ীতে। সান্তোষে শুরুর দিনগুলি ভালো হলো না। সেখানেও তাঁকে নিয়ে স্লেজিং, হাসাহাসি। এসবকে জয় করে সান্তোষের জার্সি গায়ে নামলেন প্রথম ম্যাচে। অভিষেকেই বড় ধরনের ইনজুরিতে পেলে। তাঁকে সারিয়ে তুলতে প্রাণান্ত চেষ্টা সান্তোষ কর্তৃপক্ষের। সেরে উঠে জিতলেন বড় ম্যাচ।

পনেরো পেরুনো কিশোর হয়ে উঠলেন সান্তোষের নয়নমনি। ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাবকে শিরোপা জিতিয়ে ছুটি নিয়ে এলেন বাড়ীতে। যেখানে তাঁর নাড়িপোতা। অভাবের সংসারে সংগ্রামী মা- বাবা আছেন, আর আছে ছোট দুই ভাই- বোন। পরিবারের মায়ায় পড়ে আবার বেঁকে বসেন পেলে। যেতে চান না সান্তোষের ডেরায়। বাবা- মা সেই আগের মতোই তাঁদের কালো মানিককে বুঝিয়ে, সাহস যুগিয়ে পাঠান তাঁর স্বপ্নের ঠিকানায়। এবার ১৯৫৮ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের দল ঘোষণা হলো। আরো অনেকের মতো বোর্ডে টানানো তালিকায় পরীক্ষার ফল দেখার মতোই চোখ বুলান পেলে। একেকটা নামে হাত পড়ে আর হতাশ হন। এভাবে দেখতে দেখতে কাগজের এককোনে পেয়ে যান সেই কাঙ্খিত নাম- এডসন নাসিমেন্তো দো পেলে! নাম দেখে নিজের বিস্ময় আর কাটে না। বয়স মাত্র ১৭!

এই বয়সে বিখ্যাত ব্রাজিল দলে সুযোগ পেয়ে যাবেন কল্পনায়ও আঁকতে পারেননি। খবর পেয়ে বিশ্বাস হয় না মা-বাবারও। আচমকা এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়ান পেলে। ব্রাজিলের হয়ে শুরু হয় স্বপ্নযাত্রা। গতি, স্কিলে নজর কাড়লেও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আলটাফিনি, ভাভাদের মতো প্রতিপক্ষের জালের ঠিকানা করতে পারেননি পেলে। তবে কে জানতো গ্রুপ থেকে বেরিয়েই আসল রুপে জ্বলে উঠবেন কালো মানিক। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসকে ১-০ গোলে হারানোর নায়ক তিনি। সেমিফাইনালে জাঁ ফন্তেইনের ফ্রান্স প্রতিপক্ষ। যে ফন্তেইন সুইডেন বিশ্বকাপজুড়েই গোল উৎসবে মেতেছেন। সেমিতে এসে উড়তে থাকা সেই ফন্তেইন আর তাঁর দলকে মাটিতে নামিয়ে আনলেন পেলে! ব্রাজিলের ৫-২ গোলের জয়ে তিন গোল করলেন নিজে!

গোলের চেয়েও বড় হয়ে উঠলো তাঁর গতি, স্কিল আর বল পায়ে যা ইচ্ছে তা-ই করার অবিশ্বাস্য দক্ষতা। ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্বাগতিক সুইডেন। গ্যালারী ভর্তি স্বাগতিক দর্শকের চাপও পেলে আর তাঁর দলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সেমিফাইনালের ফলটাই ফিরে এলো ফাইনালেও, ব্রাজিল ৫- সুইডেন ২! ফাইনালে পেলে করলেন দুই গোল। সব মিলিয়ে সুইডেন বিশ্বকাপে কালো মানিকের ছয় গোল। তবে গোলের চেয়েও বড় হয়ে উঠল মাত্র ১৭ বছরের এক কিশোর ব্রাজিলকে জেতালেন প্রথম বিশ্বকাপ। এরপর ১৯৬২ ও ১৯৭০ বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট তাঁর এবং ব্রাজিলের করে নেন ফুটবলের রাজা।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৩৮
  • ১১:৫৫
  • ৪:৩০
  • ৬:৪১
  • ৮:০৭
  • ৫:০৪