
বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক খাত আজ যে গভীর সংকট, দখলদারিত্ব ও লুটপাটের ইতিহাসের মুখোমুখি, তার পেছনে শুধু ব্যাংকিং ব্যর্থতা বা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা নয়; একটি দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বয়ানও কাজ করেছে। সেই বয়ানের একটি প্রভাবশালী সূত্র হলো আবুল বারকাতের মৌলবাদ, জঙ্গিত্ব ও তথাকথিত ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ নিয়ে লেখা। তার বাংলা প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশে মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমিতে প্রকাশিত হয়। পরে একই জার্নালে ২০১৯ সালে এর ইংরেজি রূপ ‘Religious Fundamentalism : Towards a Political Economy Theory’ প্রকাশিত হয়। দুটিই নিজেকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, জঙ্গিত্ব ও দেশীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবে হাজির করে। কিন্তু বাস্তবে প্রবন্ধ দুটি উগ্রবাদ-গবেষণার সীমানা অতিক্রম করে ইসলামী ব্যাংক, বীমা, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, গণমাধ্যম, রিয়েল এস্টেট, পরিবহন ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগকে একত্রে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ নামে একটি বিস্তৃত শ্রেণিতে ফেলে।
এই শ্রেণিবিন্যাস নিছক একাডেমিক শব্দচয়ন নয়; এর রাজনৈতিক অর্থ আছে। ইসলামি পরিচয়সম্পন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন একই বিশ্লেষণী কাঠামোর মধ্যে উগ্রবাদ, জঙ্গিত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রকল্পের সঙ্গে রাখা হয়, তখন ইসলামি অর্থায়ন, ধর্মভিত্তিক উদ্যোক্তা উদ্যোগ, ইসলামি সমাজসেবা এবং আইনসম্মত ব্যবসাকে সহজেই একটি গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা যায়। বাংলাদেশের মেরূকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এমন ধারণা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ এই বয়ান ইসলামি দল বা ধর্মপ্রাণ উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলা বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। পরে বড় বড় ইসলামী ব্যাংকের দখল ও লুটপাট, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ঘটনাপ্রবাহ, দেখায় যে এই বয়ানের প্রভাব সেমিনার কক্ষের বাইরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
বারকাতের তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা তিনটি ধারায় দেখা যায়। প্রথমত, তার কাজের সমর্থক সারসংক্ষেপ ও আলোচনায় ‘অর্থনীতির ভেতরে আরেক অর্থনীতি’—এই ধারণা বারবার পুনরুৎপাদিত হয়েছে। এর ফলে জনপরিসরে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ ধারণাটি স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। দ্বিতীয়ত, নীতি ও নিরাপত্তা-সাহিত্যের কিছু অংশ ধর্মীয় উগ্রবাদকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখলেও বারকাতের পরিসংখ্যান এবং অনুমান সম্পর্কে পদ্ধতিগত সতর্কতা প্রকাশ করেছে। যেমন : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তার প্রাথমিক অনুমানের উল্লেখ করলেও বলেছে, এগুলো স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই নয়; বরং ধারণামূলক পদ্ধতি ও অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। এই সতর্কতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হিসাব যদি অডিট করা প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য, মালিকানা-নথি, অর্থপ্রবাহ বিশ্লেষণ এবং আদালতে টিকে থাকা প্রমাণের ওপর নির্ভর না করে, তবে সেটি জনসন্দেহের ভিত্তি হওয়ার আগে একটি অনুমান হিসেবেই থাকা উচিত। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় বারকাতের কাঠামোকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ বয়ানটি হয়তো ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত হস্তক্ষেপকে নৈতিক আড়াল দিয়েছিল। এই তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, বারকাতের তত্ত্ব প্রভাবশালী ছিল, তার প্রমাণভিত্তি বিতর্কযোগ্য ছিল এবং তার রাজনৈতিক ফল গুরুতর ছিল।
এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো—বাংলাদেশকে উগ্রবাদ, অবৈধ অর্থায়ন, সন্ত্রাসে অর্থের ব্যবহার, বা দাতব্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অপব্যবহার উপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে না। কোনো দায়িত্বশীল গবেষক বা নীতিনির্ধারক এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু সমস্যা হলো, বারকাতের কাঠামো অপরিহার্য পার্থক্যগুলো মুছে দেয়। এটি ইসলামি ব্যাংকিংকে রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্গে, রাজনৈতিক ইসলামকে জঙ্গিত্বের সঙ্গে এবং ধর্মভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগকে অবৈধ অর্থায়নের সঙ্গে একই ধারায় বসায়। এই মিলিয়ে ফেলা একটি বিপজ্জনক বুদ্ধিবৃত্তিক শব্দভান্ডার তৈরি করেছে। একবার কোনো ইসলামী ব্যাংক বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র অংশ বলা গেলে, তার দখলকে সংস্কার, তার বঞ্চনাকে ধর্মনিরপেক্ষীকরণ এবং তার ধ্বংসকে জনস্বার্থ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়।
সমস্যা এই নয় যে বারকাত উগ্রবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এটি অবশ্যই বৈধ গবেষণার বিষয়। সমস্যা হলো, তার শ্রেণি এত বিস্তৃত যে তা প্রায় সব ধরনের ইসলামি পরিচয়সম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করতে শুরু করে। ইংরেজি প্রবন্ধে তিনি কথিত ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র খাতভিত্তিক হিসাব দেন—আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা, ফার্মাসিউটিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, পরিবহন, রিয়েল এস্টেট, গণমাধ্যম, এনজিও, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন। সেখানে আর্থিক খাতকে এই কথিত অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
এখানেই গুরুতর ধারণাগত সমস্যা দেখা দেয়। কোনো ব্যাংক ইসলামি অর্থায়ননীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হলেই সেটি মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় না। ধর্মপ্রাণ দাতাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল উগ্রবাদী প্রকল্প হয়ে যায় না। কোনো এনজিও, স্কুল, ট্রাস্ট, গণমাধ্যম বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা ব্যবস্থাপক ধর্মচর্চাকারী হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জঙ্গি রাজনীতির অংশ হয় না। এমন যুক্তি ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক উগ্রবাদের সঙ্গে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ককে অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।
ইসলামি ব্যাংকিং মূলত রিবা নিষেধ, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, শরিয়াহ পরিপালন, ঝুঁকি-বণ্টনের নীতি, নৈতিক বিনিয়োগ বাছাই এবং faith-compatible আর্থিক সেবায় আগ্রহী মানুষের সঞ্চয়কে সংগঠিত করার একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক মডেল। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো সবসময় এই আদর্শ পূরণ করেছে কি না—সেটি আলাদা ও বৈধ প্রশ্ন। কিন্তু ইসলামি পরিচয় বা কিছু প্রতিষ্ঠাতার ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইসলামী ব্যাংককে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র অংশ বলা বিশ্লেষণগতভাবে দুর্বল, যদি না প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্বচ্ছ প্রমাণ দেখানো যায় যে সেখানে বেআইনি অর্থায়ন, সহিংসতা, সন্ত্রাসে অর্থপ্রবাহ বা অপরাধমূলক রাজনৈতিক তহবিলায়ন হয়েছে।
বাংলাদেশে ইসলামি অর্থায়ন নিয়ে আমার নিজের কাজ বরাবরই এই পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমি শক্তিশালী সুশাসন, উন্নত নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন শরিয়াহ তত্ত্বাবধান, ইসলামি মুদ্রাবাজার, ইসলামি পুঁজিবাজার উন্নয়ন এবং আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পক্ষে লিখেছি। আমার গবেষণা ইসলামি ব্যাংকিংকে রোমান্টিক করে না; বরং এটিকে একটি আর্থিক শিল্প হিসেবে দেখে, যার জন্য শক্তিশালী আইন, বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ মালিকানা, সুস্থ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার শরিয়াহ সুশাসন জরুরি।
এই ফ্রেমিং বা প্রশ্নের ধরনই মূল পার্থক্য তৈরি করে। বারকাতের কাঠামো জানতে চায়—মৌলবাদের গোপন অর্থনৈতিক ভিত্তি কোথায়? আমার কাঠামো জানতে চায়—ইসলামি অর্থায়নকে কীভাবে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করা যায়, যাতে তা আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নকে এগিয়ে নেয়, রাজনৈতিক দখল এড়ায় এবং আইন ও নৈতিকতার কাছে জবাবদিহি থাকে? এই দুটি প্রশ্ন এক নয়। প্রথমটি সন্দেহ থেকে শুরু করে; দ্বিতীয়টি প্রাতিষ্ঠানিক নকশা থেকে শুরু করে।
বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক খাতের পরবর্তী সংকট এই পার্থক্যের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট করে। খাতটির সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ইসলামি অর্থায়নের ধারণা থেকে আসেনি। এসেছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা, মালিকানা দখল, অভ্যন্তরীণ ঋণ, দুর্বল বোর্ড সুশাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ক্ষয় থেকে। আমার সাম্প্রতিক লেখা ‘Shariah Board Protection Is Not Enough : Lessons from Malaysia’-এ আমি যুক্তি দিয়েছি, বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক খাত তার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সুশাসন সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের দখল শরিয়াহ-জ্ঞানীর ব্যর্থতা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক নকশার ব্যর্থতা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা ও জবাবদিহির অভাব এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যেখানে ব্যাংক-মালিকরা শরিয়াহ বোর্ডকে প্রকৃত তত্ত্বাবধায়ক নয়, বরং অলংকারে পরিণত করতে পারে।
এখানেই বারকাত-সমালোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন দাঁড়ায়। ইসলামী ব্যাংককে যদি ইসলামি পরিচয়ের কারণে সন্দেহ করা হয়, তাহলে নীতিগত প্রতিক্রিয়া দাঁড়ায় আদর্শিক নিরস্ত্রীকরণ। কিন্তু ইসলামী ব্যাংককে যদি সুশাসন-ঝুঁকিতে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নীতিগত প্রতিক্রিয়া হবে আইন সংস্কার, নিয়ন্ত্রক তদারকি, মূলধন পর্যাপ্ততা, related-party lending নিয়ন্ত্রণ, শরিয়াহ অডিট এবং আমানতকারী সুরক্ষা। বাংলাদেশের দরকার ছিল দ্বিতীয় পথ। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে আমরা প্রথম পথের ভাষা ও মানসিকতা দেখেছি।
লেখক : অধ্যাপক, ফাইন্যান্স; ইসলামি ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স গবেষক
নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য