
গত ১২ বছরে দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছেন লিওনেল মেসি। দুই ফাইনালেই দম বন্ধ হয়ে আসা সব মুহূর্ত। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে অতিমানব হয়ে স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছিলেন। শেষপর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে ট্রফি জিতেন মেসি। চার বছর আগের সেই ফাইনালটাই যেন ফিরে এসেছিল আজ ভোরে! পার্থক্য কেবল মেসিদের সামনে ফ্রান্সের বদলে কেপ ভার্দে, ফাইনালের জায়গায় রাউন্ড অব ৩২ এর ম্যাচ! কোনটা কঠিন, ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনাল নাকি কেপ ভার্দের বিপক্ষে আজকের ম্যাচ? মেসিকে প্রশ্ন করা হলে হয়ত কেপ ভার্দে ম্যাচের কথাই বলবেন। বলারই কথা। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক কি একবারের জন্যও ভেবেছিলেন আফ্রিকার অখ্যাত, অপরিচিত একটা দল তাঁদেরকে কাঁদিয়ে ছাড়বে। ফুটবল মাঝেমধ্যে এমন সব আচরণ করে। বিশ্বকাপে অঘটন শব্দটা বড় হয়ে উঠে প্রায়ই। ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ১৯৯০ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে এমনই এক অঘটনের শিকার হয়েছিল। রজার মিলার ক্যামেরুন ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ৮৬ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। ৩৬ বছর পর এরকমই এক চিত্রনাট্য যেন ফিরে এসেছিল মায়ামিতে! যেখানে রজার মিলা হতে পারতেন ভোজিনিয়া, মায়ামির সবুজ ঘাস মেসিকে বানিয়ে দিতে পারতো ৯০ এর ম্যারাডোনা। একেকটা মিনিট মনে হয়েছে এই বুঝি স্বপ্ন শেষ। বল মাঠে গড়ানোর পর মিনিট পাঁচেক কেপ ভার্দের দখলে নিয়ন্ত্রণ। এরপর মেসি, ডি পল, রোমেরোদের পায়ে চিরচেনা ছন্দময় ফুটবল। এসব থেকে আক্রমণও হলো কয়েকটি। কিন্তু কেপ ভার্দের গোলপোস্টে যে দিনো জফ, অলিভার কানদের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেউ একজন। যার আবার বয়স মেসির চেয়েও এক বছর বেশি! তবে একজনের কাছে তো বয়সের হিসেব কিংবা গোলপোস্টে বাজপাখি হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার বাঁধাও কিছু নয়। যে ছুটলে টাইম মেশিনও যেন ছুটে তাঁর সাথে, যে জায়গামতো দাঁড়ালে পৃথিবীর কোন শক্তিরই যেন ক্ষমতা নেই তাঁকে গোল থেকে বঞ্চিত করার! ২৯ মিনিটে এমনই এক দৌড়ে কেপ ভার্দের পেনাল্টি বক্সে ঢুকলেন লিওনেল মেসি। ছকটা যেন আগে থেকেই সাজানো। মাঝমাঠ থেকে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ মেসিকে উদ্দেশ্য করেই বাড়ালেন বল। বিখ্যাত বাঁ পায়ে বল নামিয়েই ভোজিনিয়ার মাথার ওপর দিয়ে পাঠালেন জালে। এই গোলে রেকর্ড বুকে নিজেকে আরো উচ্চতায় তুলেন বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় শীর্ষ স্থানটা ধরে রাখলেন(২০টি)। এবারের বিশ্বকাপেও সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় সবার ওপরেই নাম মেসির(৭টি)। আর টানা আট বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল এক কীর্তি গড়লেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। মেসির গোলের জবাব কেপ ভার্দে দিল ৫৮ মিনিটে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখে তাঁরা। সেই চাপ থেকেই বক্সের ভেতর থেকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন দেরয় দুয়ার্তে। গোল খেয়ে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। একের পর এক আক্রমণও গড়ে তুলে। কিন্তু ওই যে গোলপোস্টের ভোজিনহা। সবগুলোই ব্যর্থ করে দেন তার বিশ্বস্থ হাতে। ৯২ মিনিটে তাঁর প্রতিরোধ ভেঙে গোল পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্ণার থেকে উড়ে আসা বল ম্যাক এ্যালিস্টারের মাথা ছুঁয়ে আসে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের কাছে। মেসি থেকে আরো দূরে দাঁড়িয়ে দারুণ এক শটে গোল করেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। তবে কে জানতো এই ম্যাচের চিত্রনাট্য তখনো বাকি। নির্ধারিত সময় আর যোগ করা সময় শেষে রেফারী ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজানোর অপেক্ষায়। তখনই মায়ামির গ্যালারীকে স্তব্ধ করে দিয়ে সিডনি লোপেজের গোল! বাঁ প্রান্ত দিয়ে কাট করে আর্জেন্টিনা সীমানায় ঢুকে বাঁকানো শটে যে গোল করেন লোপেজ সেটি এই বিশ্বকাপের সেরা গোলের একটি। ২-২ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচ গড়ালো অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। টাইব্রেকারের হিসেব করে অনেকেই তখন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ আর ভোজিনিয়ার খুঁটিনাটি খুঁজছেন। কিন্তু কেপ ভার্দের রুদ্রমূর্তি, ঘানার জাদুকরের ভয় ধরিয়ে দেয়া বার্তা ছাপিয়ে এই ম্যাচের ভাগ্য লেখা তো আর্জেন্টিনার পক্ষে। তাই ১১৫ মিনিটে এলো বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের তৃতীয় গোল। মেসির কর্ণার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর দুর্দান্ত হেড ভোজিনিয়ার হাত ছুঁয়ে আশ্রয় নেয় জালে। আর্জেন্টিনা ৩ – কেপ ভার্দে ২! ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের মতোই অসাধারণ এক থ্রিলার শেষে শেষ হাসি আর্জেন্টিনার। লিওনেল মেসি, ডি পল, আলভারাজদের কাছে বিশ্বকাপে নবাগত কেপ ভার্দে থাকবে ফ্রান্সের মতোই ভয়ংকর স্মৃতি হয়ে!



