বাড়িতে চলছিল বিয়ের উৎসব। কনে বিদায়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন স্বজনেরা। আনন্দঘন সেই মুহূর্তেই বাড়ির পাশের পুকুরে ভেসে ওঠে তিন শিশুর নিথর দেহ। খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়। গত বছরের ১৪ অক্টোবর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর গ্রামের সেই মর্মান্তিক ঘটনা এখনও স্থানীয় মানুষের মনে দাগ কেটে আছে।
এর কয়েক মাস পর, চলতি বছরের ১০ জুলাই লাখাই উপজেলায় ঘটেছে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। ইতালি থেকে দেশে ফেরা এক দম্পতি দুই সন্তানকে নিয়ে স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন। রাতের কোনো এক সময় সবার অগোচরে বাড়ির সামনের জলাশয়ে পড়ে ডুবে মারা যায় তাদের এক সন্তান। দেশে ফেরার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় আজীবনের শোকে।
দুটি ঘটনা আলাদা হলেও বাস্তবতা একই। হবিগঞ্জে নিরাপত্তাবেষ্টনীহীন পুকুর, ডোবা, খাল ও নদী একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের প্রাণ। গত এক বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে অন্তত ২৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খেলতে গিয়ে কিংবা পরিবারের সদস্যদের অজান্তে বাড়ির পাশের জলাশয়ে পড়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়ে জেলার কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে অন্তত ২৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। পরে গত ৩০ জুলাই শায়েস্তাগঞ্জে ডোবার পানিতে পড়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ জনে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পাঁচজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে নবীগঞ্জ ও মাধবপুরে। চুনারুঘাট ও লাখাইয়ে চারজন করে, হবিগঞ্জ সদরে তিনজন এবং শায়েস্তাগঞ্জ, বাহুবল ও বানিয়াচংয়ে দুইজন করে শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত শিশুদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকায় অনেক শিশু বাড়ির আশপাশে একা কিংবা সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে বের হয়। সেই সুযোগে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা কিংবা খালই হয়ে ওঠে তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। শিশুটি কোথায় আছে, কতক্ষণ ধরে বাইরে রয়েছে কিংবা কার সঙ্গে খেলছে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায় অপূরণীয় ক্ষতি। পানিতে পড়ে যাওয়ার পর দ্রুত খুঁজে না পাওয়াও অনেক সময় মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাওর ও জলাশয়বেষ্টিত জেলা হওয়ায় হবিগঞ্জে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। জেলার অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির খুব কাছেই রয়েছে পুকুর, ডোবা, খাল বা নদী। বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়ে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ জলাশয়ের চারপাশে কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। অনেক পুকুরের পাড় অরক্ষিত ও পিচ্ছিল। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠান থেকে অল্প দূরেই রয়েছে গভীর পানি, যা শিশুদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে ধারাবাহিকভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে কার্যকর সচেতনতামূলক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও হাওরাঞ্চলে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সার্বক্ষণিক তদারকির বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি বাহার উদ্দিন বলেন, ‘বছরের পর বছর পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসতর্কতাও দেখা যায়। কিন্তু হাওর ও গ্রামীণ এলাকায় এ বিষয়ে সরকারের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি খুব একটা চোখে পড়ে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো যেত। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকেও ভেঙে দেয়। তাই এ ধরনের মৃত্যু ঠেকাতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।’



