নিহত সপ্তম রায় প্রীতম সিলেট মহানগরের সোবহানিঘাট এলাকার বাসিন্দা উত্তম রায়ের ছেলে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন ভদ্র, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল একজন তরুণ। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা ছিল তাঁর প্রতিদিনের লড়াই।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-২৫৬৩) একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার (ঢাকা মেট্রো-ব ১২-৫৯৮৭) কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় আরও দুজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে দুর্ঘটনায় মোট নয়জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত অন্তত ১৪ জন বর্তমানে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
স্বজনদের ভাষ্য, রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হওয়া এই যাত্রাই যে প্রীতমের জীবনের শেষ যাত্রা হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করতে তিনি নিয়মিত কাজ করতেন। নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্নের চেয়ে বৃদ্ধ মা ও বোনের জীবনটাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নিরলস পরিশ্রম করতেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই সংগ্রামী তরুণের জীবন থেমে গেল মহাসড়কের রক্তাক্ত এক সকালে।
প্রীতমের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে সোবহানিঘাট এলাকা। তাঁর বাড়িতে ছুটে আসেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউই এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না।
প্রতিবেশী নরেন ভট্টাচার্য্য বলেন, “নিহতদের তালিকায় সপ্তমের নাম দেখে হৃদয় ভেঙে গেছে। ছোটবেলা থেকে তাকে কোলে-পিঠে করে বড় হতে দেখেছি। তারা আমাদের পাশের বাসার ভাড়াটিয়া ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে খুব শান্ত ও ভদ্র ছিল। পরিবারের জন্য কত কষ্ট করেছে, তা আমরা সবাই জানি।”
তিনি আরও বলেন, “এর আগে পানিতে ডুবে তার একমাত্র ভাই মারা গিয়েছিল। তখন থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব প্রীতমের ওপর এসে পড়ে। বৃদ্ধ মা আর বোনকে নিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছে। এখন এই শোক তার মা ও বোন কীভাবে সহ্য করবেন, তা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।”
স্থানীয়রা জানান, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিল। এক ছেলেকে হারানোর পর প্রীতমই ছিলেন পরিবারের শেষ ভরসা। তাঁর আয়েই চলত সংসার। এখন তাঁর মৃত্যুর পর বৃদ্ধ মা ও বোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সড়ক দুর্ঘটনার এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মহাসড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস চালানোর প্রবণতা এবং কার্যকর তদারকির অভাবের কারণেই বারবার এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। তাঁদের দাবি, শুধু তদন্ত নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
একটি দুর্ঘটনায় নয়জন মানুষের জীবন থেমে গেছে। তবে সপ্তম রায় প্রীতমের মৃত্যু যেন আরও একটি নির্মম বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একজন মানুষের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও নিভে যাওয়া।



