চকরিয়া ও মাতামুহুরীর মাঠ থেকে বন্যার পানি সরে গেছে কয়েক দিন আগেই। কিন্তু কৃষকের বুকভরা কষ্ট, হতাশা আর অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। যেসব জমিতে কয়েক সপ্তাহ আগেও সবুজ ধান, কচু, ঢেঁড়শ, করলা, বেগুন আর শসার সমারোহ ছিল, আজ সেখানে পড়ে আছে পচে যাওয়া গাছ আর স্তূপ হয়ে থাকা কাদা।
প্রশ্ন হলো, এখন কৃষক কী করবে?
যে কৃষক নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা ধার করে জমিতে ফসল ফলিয়েছিলেন, তিনি এখন কোথায় যাবেন? পানিতে তলিয়ে যাওয়া সবজি তো আর বাজারে নিয়ে বিক্রি করা সম্ভব নয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া আমনের বীজতলা থেকে তো আর নতুন ফসল জন্মাবে না। কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার পর একজন কৃষকের সামনে আসলে কী পথ খোলা থাকে?
অনেকেই বলবেন, সরকার সহায়তা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে একসঙ্গে বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। সরকারি প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে অনেক সময় কেটে যায়। কিন্তু কৃষকের সংসার তো অপেক্ষা করে না। সন্তানদের খাবার লাগে, বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ লাগে, সংসারের খরচ চলে প্রতিদিন।
আজ একজন কৃষক শুধু ফসল হারাননি; তিনি হারিয়েছেন তার ভবিষ্যতের স্বপ্নও। যিনি প্রতি সপ্তাহে বাজারে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন, তিনি আজ আয়শূন্য। যিনি আশা করেছিলেন ভালো ফলন হলে ছেলের স্কুলের বেতন দেবেন, মেয়ের জন্য নতুন পোশাক কিনবেন, তিনি আজ নতুন করে ঋণের চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এই ক্ষতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। কৃষক যদি আগামী মৌসুমে আবার চাষ করতে না পারেন, তাহলে তার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের খাদ্যব্যবস্থার ওপর। মাঠে ফসল কম হবে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, আর সেই বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
আজ চকরিয়া ও মাতামুহুরীর কৃষকরা কোনো দয়া চান না, তারা চান বেঁচে থাকার সুযোগ। তারা চান এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দুর্যোগের পর অন্তত নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু পাওয়া যায়। কারণ একজন কৃষকের হাতে যদি আবার বীজ তুলে দেওয়া যায়, তাহলে তিনি নিজের ভাগ্য নিজেই বদলে নিতে পারবেন।
বন্যার পানি নেমে গেছে, কিন্তু হাজারো কৃষক আজও অনিশ্চয়তার স্রোতে ভাসছেন। তাদের কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও কৃষিনির্ভর জীবনের কান্না। তাই সময় থাকতে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কৃষকের ঘরে যখন চুলা জ্বলে না, তখন শুধু একটি পরিবার ক্ষুধার্ত থাকে না—ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে পুরো দেশের স্বপ্ন।
আমারসিলেট/হা



