সুনামগঞ্জে ধারাবাহিক ফলাফল বিপর্যয়, কমছে পাসের হার ও জিপিএ-৫

সুনামগঞ্জে ধারাবাহিক ফলাফল বিপর্যয়, কমছে পাসের হার ও জিপিএ-৫

২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে গত চার বছরের ন্যায় এবারও সুনামগঞ্জ জেলায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চার জেলার ফলাফলের মধ্যে পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুনামগঞ্জ।

চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলা থেকে ১৮ হাজার ২৯২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১০ হাজার জন। জেলায় পাসের হার ৫৪.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪১০ জন।

শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রতি আসক্তির কারণে ফলাফলে এমন বিপর্যয় ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই ধারাবাহিক দরপতন দীর্ঘমেয়াদে জেলার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় পাসের হার ছিল ৭৯.৯৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৬৮ জন। ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল ৭৫.৪৯ শতাংশ ও জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৫৬ জন। ২০২৪ সালে পাসের হার দাঁড়িয়েছিল ৭৪.৪১ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৪৫ জন। ২০২৫ সালে তা আরও কমে পাসের হার হয় ৬৮.৪৬ শতাংশ ও জিপিএ-৫ পায় ৪১৭ জন। আর চলতি ২০২৬ সালের পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৫৪.৬৭ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১০ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও জেলাভিত্তিক তালিকার ১২টি উপজেলার মধ্যে তুলনামূলক ভালো ফলাফল করেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা। এ উপজেলায় ২ হাজার ৪৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১ হাজার ৬২৮ জন; পাসের হার ৬৫.৭৮ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬৩ জন।

অন্যদিকে এবারের ফলাফলে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে দোয়ারাবাজার, শান্তিগঞ্জ, তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলা। এর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে নিচে তাহিরপুর। এবার দোয়ারাবাজার উপজেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৯ জন, শান্তিগঞ্জে ১০ জন এবং তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলায় ১১ জন করে। জেলার তিনটি উপজেলা— তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও দিরাইয়ে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। তাহিরপুরে পাসের হার ৪১.১৮ শতাংশ (জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ জন), দোয়ারাবাজারে পাসের হার ৪৭.৮৬ শতাংশ (জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ জন) এবং দিরাইয়ে পাসের হার ৪৯.৬২ শতাংশ (জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৯ জন)।

এ ছাড়া অন্যান্য উপজেলার মধ্যে শান্তিগঞ্জে পাসের হার ৬৩.৪৬% (জিপিএ-৫ ১০ জন), ছাতকে ৫২.০৬% (জিপিএ-৫ ৩৬ জন), জগন্নাথপুরে ৫৩.৬৮% (জিপিএ-৫ ২৩ জন), জামালগঞ্জে ৬৩.৪৭% (জিপিএ-৫ ২৮ জন), শাল্লায় ৫৫.৯৮% (জিপিএ-৫ ১১ জন), বিশ্বম্ভরপুরে ৫৪.৪১% (জিপিএ-৫ ২৩ জন), ধর্মপাশায় ৫২.২৫% (জিপিএ-৫ ২৯ জন) এবং মধ্যনগর উপজেলায় পাসের হার ৬১.১৬% (জিপিএ-৫ ২৮ জন)।

প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬২টি জিপিএ-৫ পেয়ে জেলায় শীর্ষে রয়েছে সুনামগঞ্জ শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়। অন্যদিকে শতভাগ পাসের সাফল্য দেখিয়েছে ছাতকের ব্রিজ একাডেমি; তাদের ১৪ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে এবং ২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তবে কিছু স্কুলে চরম বিপর্যয় লক্ষ্য করা গেছে। শাল্লা উপজেলার কালাই মিয়া চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১ জন (পাসের হার ৭.৬৯%)। তাহিরপুর উপজেলার আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৫ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৫ জন (পাসের হার ১১.১১%) এবং ছাতক উপজেলার হায়দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪০ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৬ জন (পাসের হার ১৫.০০%)।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মীর রেজা বলেন, এসএসসি ফলাফলের এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে সুনামগঞ্জ জেলায়। উচ্চশিক্ষাসহ আগামীতে জাতীয়পর্যায়ের অনেক ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি, পারিবারিক তদারকি কমে যাওয়া, ডিজিটাল মাধ্যমে আসক্তি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে দায়ী করেন।

টিআইবি সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য ও আইনজীবী খলিল রহমান বলেন, সুনামগঞ্জের শিক্ষার মান উন্নয়নে আলাদা কৌশলগত চিন্তা করা প্রয়োজন। আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ কোচিং বা অতিরিক্ত ক্লাসের যে ব্যবস্থা ছিল, তা এখন অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যস্ততা পড়াশোনায় অমনোযোগ তৈরি করছে।

তাহিরপুরের জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের জেলা সভাপতি মোদাচ্ছির আলম সুবল বলেন, এনটিআরসিএ থেকে সময়মতো শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় তীব্র শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। তাছাড়া বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হলেও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। বেতন-ভাতার বৈষম্যের কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জুলফিকার হোসেন বলেন, অনন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব আমাদের প্রধান সমস্যা। অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী না হয়ে প্রাইভেট বা নিজ কোচিংয়ে বেশি আগ্রহী থাকেন। এছাড়া এনটিআরসিএ বদলী নীতিমালা চালু হলে জেলার অনেক শিক্ষক নিজ এলাকায় চলে যেতে পারেন, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করবে।

সুনামগঞ্জ জেলায় বর্তমানে ২১১টি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৩টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ৩৫টি বেসরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ১টি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ৯৫টি মাদ্রাসা রয়েছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:০৪
  • ১২:০২
  • ৪:৩৫
  • ৬:৩৬
  • ৭:৫৫
  • ৫:২৩