নিহত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। ছবি : সংগৃহীত

সিলেট নগরীর রায় নগর রাজবাড়ি এলাকার নিজ বাস ভবনে প্রবীণ ব্যবসায়ী, তাঁর স্ত্রী ও গৃহকর্মীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৬ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনার দিন বিকেলে বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক রংমিস্ত্রি ও কসাইকে আটকের পর পুলিশের দাবি— বাসার গৃহকর্মীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে ব্যর্থ হয়েই একাই তিনজনকে হত্যা করেছে বাবুল। আসামি নিজেও এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে ঘটনার আলামত, পরিস্থিতি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান পর্যালোচনা করে পুলিশের এই দ্রুত ‘রহস্য উদঘাটনের’ দাবি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক ধোঁয়াশা ও জটিল প্রশ্ন। আইনজীবী, স্থানীয় অধিবাসী ও সচেতন মহলের মতে— সাধারণ প্রেম কিংবা শারীরিক সম্পর্কের ব্যর্থতায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকলে ঘরের ভেতরের আলমারি-ওয়ারড্রব তছনছ করা হলো কেন? ঘরের মেঝেতে কেবল জমিসংক্রান্ত মামলার দরখাস্ত বা দলিলের কপি পড়ে রইল কেন? কিংবা আগামী ১৯ আগস্ট কোটি টাকার জমি মামলার শুনানির ঠিক ছয় দিন আগে এই ট্রিপল মার্ডার কেবলই কাকতালীয়?

রক্তঝরা সকাল ও প্রাথমিক আলামত

গত বুধবার সকালে নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)। এই বৃদ্ধ দম্পতির চার সন্তানই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ জানায়, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা এবং তছনছ করা অবস্থায় ছিল। মেঝেশুদ্ধ জিনিসপত্র ছড়ানো-ছিটানো এবং স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার প্রাথমিক আলামত দেখা যায়। একই সাথে ঘরের মেঝেতে একটি বিষয়ের জমিসংক্রান্ত দলিল ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

পুলিশের দ্রুত দাবি ও বাবুলের জবানবন্দি

বুধবার বিকেলে একই এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে আটক করার পর সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, “বাবুল ওই বাসার রংমিস্ত্রি ছিল এবং মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজ করত। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে তাহমিনাকে নিয়ে একটি কক্ষে ঢোকে। সেখানে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে বাকবিতণ্ডা হয় এবং একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে কোপায়। ধস্তাধস্তির শব্দ ও চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম ও পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে বাবুল দুজনকেই কুপিয়ে হত্যা করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।”

তবে পরবর্তীতে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির জানান, “বাবুল হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও বাসা থেকে কোনো মালামাল নেয়নি বলে দাবি করেছে। আলমারি খোলা দেখে পুলিশ কমিশনার মহোদয় খোয়া যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তবে পরিবার এখনো নির্দিষ্ট তালিকা দেয়নি।”

গৃহকর্মীর প্রেমিক বাবুলকে আটক করে পুলিশ। ছবি : আমার সিলেট

পুলিশের দাবির বিপরীতে যে প্রশ্নগুলো মিলছে না

পুলিশের এমন তড়িঘড়ি তদন্ত ও কারণ দর্শানো নিয়ে স্থানীয় অধিবাসী, আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুল একাধিক আইনি প্রশ্ন তুলেছেন: শারীরিক সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে প্রেমিকার কাছে যাওয়ার জন্য সকাল সাড়ে ৯টা কতটা যুক্তিযুক্ত সময়? যদি শুধুই শারীরিক সম্পর্কের জন্য বাবুল গিয়ে থাকে, তবে তার সাথে আগে থেকেই মানুষ খুন করার উপযুক্ত ধারালো কসাইয়ের ছুরি রাখার উদ্দেশ্য কী ছিল? তিনটি খুন করার পর পেশাদার কিংবা অপেশাদার যেকোনো খুনিই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, কিন্তু আসামি আটক হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই একই পাড়াতেই অবস্থান করছিল কেন? ২৫ বছরের গৃহকর্মী তরুণীর সঙ্গে প্রায় ৪০ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি/কসাইয়ের অনৈতিক সম্পর্কের তত্ত্ব কতটুকু বাস্তবসম্মত?

জমিসংক্রান্ত মামলা ও কোটি টাকার বিরোধের সূত্র

অনুসন্ধানে জানা যায়, রিকাবীবাজারের একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় জমি ও সেখানে ‘ইম্পাস টাওয়ার’ নির্মাণকে কেন্দ্র করে এলাকার এক প্রভাবশালী পক্ষের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের কোটি টাকার জমি নিয়ে আদালত পর্যন্ত স্বত্ব মামলা (নম্বর ২১১/২৩) চলছে।

নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক নিশ্চিত করে জানান, “এই মামলার বিবাদী সিরাজুল ইসলাম পরবর্তীতে একটি সিভিল রিভিশন মামলা (নম্বর ৭০/২৩) দায়ের করেন। আগামী ১৯ আগস্ট ওই গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। নিহত সাত্তার সাহেব প্রায় প্রতিটি শুনানিতে উপস্থিত থাকতেন। দুই সপ্তাহ আগের শুনানিতেও বিবাদী সিরাজুল ইসলাম আদালতে আব্দুস সাত্তারকে সরাসরি হুমকি ও দুব্যবহার করেছিলেন।”

তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের ঘরের ওয়ারড্রব ও আলমারি থেকে কেবল উক্ত মামলার মূল নথিপত্র ও মূল দলিলের ফাইলটি গায়েব হয়ে গেছে। ঘরের মেঝেতে কেবল একটি ফটোকপি/অনুলিপি ফেলে রাখা হয়েছিল।

স্বজন ও রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই পেশাদার খুনি দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। রিকাবীবাজারের বিরোধপূর্ণ জায়গা ও আগামী শুনানির বিষয়টিকে মূল সূত্র ধরে নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত।”

নিহতের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় জানান, “হত্যাকাণ্ডের পর আলমারির কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করা দেখেই আমরা বুঝেছি এটি চক্রান্ত। এর আগেও আব্দুস সাত্তারকে বাসায় এসে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে তাঁর মেয়ে থানায় জিডিও করেছিলেন।”

সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, কেবল একজন কসাইকে বলির পাঁঠা বানিয়ে একটি সুপরিকল্পিত ট্রিপল মার্ডারের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা যাতে পার পেয়ে না যায়, সে জন্য পুলিশের উচিত জমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং উদ্ধার হওয়া দলিলাদির সূত্র ধরে অধিকতর গভীর তদন্ত পরিচালনা করা।

One thought on “পুলিশের ‘রহস্য উদঘাটন’ ঘিরে প্রশ্নের জট”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *