দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। একের পর এক চা-শ্রমিক সংগঠন দাবি আদায়ে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া চা-বাগানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।
সমাবেশ থেকে ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানান শ্রমিকনেতারা।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) মুরইছড়া চা-বাগানে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়কৃষান। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সত্যজিৎ উরাং সমাবেশ সঞ্চালনা করেন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ, সমন্বয়ক মনীষা ওয়াহিদ, শ্রমিকনেতা ভাগ্য, রাজু উরাং, মনি নায়েক ও মালতি রায়সহ অন্যরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, চা-শ্রমিকেরা দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের মৌলিক নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। প্রায় ১৮৫ বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস করলেও চা-শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো ভূমিহীন।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে একজন চা-শ্রমিক দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি পান। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করলে তাঁর সাপ্তাহিক আয় দাঁড়ায় ১ হাজার ১২২ টাকা এবং ২৬ কর্মদিবস হিসাবে মাসিক মজুরি হয় ৪ হাজার ৮৬২ টাকা। এর সঙ্গে বাগানভেদে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হতে পারে। তবে শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মজুরি দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পরিবার চালানো কঠিন।
শ্রমিকনেতারা বলেন, কোনো কোনো বাগানে নির্দিষ্ট পরিমাণ চা-পাতা উত্তোলন করলেই দৈনিক হাজিরা নিশ্চিত হয়। কোথাও ২৩ কেজি, কোথাও ২৪ থেকে ২৫ কেজি পাতা তুলতে হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বেশি পাতা তুললেও শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
সমাবেশে বক্তারা প্রতিবেশী ও অন্যান্য চা উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের মজুরির সঙ্গে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের মজুরির তুলনা তুলে ধরেন।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের আসাম সরকার চা-শ্রমিকদের মজুরি ৩০ রুপি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মজুরি ৩৫৮ রুপি এবং বরাক উপত্যকায় ৩৩০ রুপি হয়েছে। ভারতের কেরালায় দৈনিক মজুরি ৪২১ রুপি, তামিলনাড়ুতে ৪০৬ রুপি এবং কর্ণাটকে ৩৭৬ রুপি পর্যন্ত।
বক্তাদের দাবি, শ্রীলঙ্কায় চা-শ্রমিকেরা দৈনিক প্রায় ৫৫০ টাকা এবং কেনিয়ায় প্রায় ৪৮৩ টাকা মজুরি পান। অথচ বাংলাদেশের চা-শ্রমিকেরা এর তুলনায় অনেক কম মজুরিতে কাজ করছেন।
চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতারা বলেন, ২০২৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, এতে দৈনিক মজুরি মাত্র কয়েক টাকা বাড়ে। অথচ একই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাজারে একটি ডিমের দাম ১২ টাকার বেশি, এক কাপ চায়ের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং পানের পেছনেও প্রায় ১০ টাকা খরচ হয়। এমন পরিস্থিতিতে দৈনিক কয়েক টাকা মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে না।
তাঁরা ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে অবিলম্বে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি জানান।
চা-শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, দেশে প্রতিবছর চা উৎপাদন বাড়ছে। চা বোর্ড ২০২৬ সালে ১০ কোটি ২৬ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৯০ লাখ ৭৩ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার কেজি।
চা-শ্রমিক নেতারা বলেন, শুধু উৎপাদন নয়, নিলামেও চায়ের দাম বেড়েছে। ২৭ এপ্রিল শুরু হওয়া চলতি নিলাম বর্ষের চট্টগ্রামের প্রথম নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে ২৭৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এরপরও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে মালিকপক্ষ অনাগ্রহী বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
তবে চা-বাগান মালিকদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সমাবেশে ২০২২ সালের চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন বক্তারা। তাঁদের দাবি, ওই বছরের আগস্টে চা-শ্রমিকেরা ১৯ দিন কর্মবিরতি ও আন্দোলন করে দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়াতে সক্ষম হন।
শ্রমিকনেতারা বলেন, মজুরি বাড়ানোর পর বকেয়া মজুরি বা অ্যারিয়ার নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাঁদের দাবি, প্রায় ৩৩ হাজার টাকা করে বকেয়া পাওনা তৈরি হলেও শ্রমিকদের প্রত্যেককে ১১ হাজার টাকা করে তিন কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়। ফলে একজন শ্রমিক প্রায় ২২ হাজার টাকা করে বকেয়া পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তবে বকেয়া মজুরির বিষয়ে মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য চা-শ্রমিক ইউনিয়নের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিরও দায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় চা-শ্রমিকদের যৌথ দরকষাকষির প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকেরা দ্রুত নির্বাচন দিয়ে তাঁদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব ছাড়া চা-শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি দাবি আদায়ের আন্দোলন কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
সমাবেশে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ বলেন, ২০২২ সালের আগস্টে চা-শ্রমিকেরা দীর্ঘ ১৯ দিন খেয়ে না খেয়ে রাজপথে আন্দোলন করে মজুরি বাড়িয়েছিলেন। এবারও রাষ্ট্রীয় মদদে শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে অধিকার আদায় করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘চা-শ্রমিকেরা আজ অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করছেন। সংসদে নয়, চা-শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাবে রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমেই।’
সমাবেশ থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ, ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।
চা-শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, দাবি আদায় না হলে পর্যায়ক্রমে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।



