মৌলভীবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনজীবী সুজন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একের পর এক সহিংসতা, সংঘর্ষ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—কিশোর গ্যাংয়ের আড়ালে কি রয়েছে আরও শক্তিশালী কোনো অপরাধী চক্র? কিশোরদের সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে কারা এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
মৌলভীবাজার দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট নিয়ামুল হক এক বিবৃতিতে কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা কথিত মদদদাতা ও মূল হোতাদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এপিপি নিয়ামুল হক বলেন, মৌলভীবাজারে হাতে গোনা কিছু উশৃঙ্খল কিশোর পুরো শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। তবে এসব কিশোরের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যেন প্রকৃত মদদদাতা বা নেপথ্যের অপরাধীচক্র আড়ালে থেকে না যায়। তার ভাষ্য, কিশোরদের ব্যবহার করে কোনো শক্তিশালী অপরাধী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে।
নিয়ামুল হক আরও দাবি করেন, কিশোরদের ব্যবহার করে নেপথ্যের অপরাধীচক্র মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড বিস্তারের চেষ্টা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়াও চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকেও অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দৃশ্যমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও নেপথ্যের মদদদাতাদের বিষয়ে আরও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, অপরাধের মূল উৎস শনাক্ত করা না গেলে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
দর্শকের ভূমিকায় নাগরিকরা
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এপিপি নিয়ামুল হক।
তিনি বলেন, কয়েকজন কিশোর প্রকাশ্যে অপরাধ সংঘটিত করলেও অনেক মানুষ তা প্রতিহত করার পরিবর্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন। এ ধরনের নীরবতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করতে পারে।
তার মতে, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যের সঙ্গে সংঘটিত অপরাধকে নিজের সমস্যা নয় বলে এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
চার দফা সুপারিশ
মৌলভীবাজার শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা কথিত মদদদাতা ও গডফাদারদের শনাক্ত করে তদন্তের আওতায় আনা।
অপরাধে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের পরিবার ও অভিভাবকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা।
অপরাধ সংঘটিত হলে আইন নিজের হাতে না তুলে দিয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেওয়া এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধু-বান্ধব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়ানো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোর অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদক, সামাজিক পরিবেশ ও মূল্যবোধের বিষয়ও জড়িত। তাই পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা, কিশোর গ্যাংয়ের দৃশ্যমান সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পেছনে কোনো সংগঠিত অপরাধীচক্র বা মদদদাতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে অপরাধী যে-ই হোক, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনা হবে—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।



