ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে তখন সন্ধ্যা নামছে। গ্যালারি প্রায় ফাঁকা, কিন্তু বাংলাদেশের ডাগআউট থেকে বেজে উঠলো বিজয়ের গান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে যে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ, তার প্রতিধ্বনি যেন ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো ডারউইনে।
ম্যাচ জয়ের পরও বাংলাদেশের উদ্যাপনে ছিল না উচ্ছৃঙ্খলতার ছাপ। মুমিনুল হক জয়সূচক রান করার পরও সেভাবে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে উদ্যাপন করেননি। প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর মিরাজ-মুশফিকরা স্মারক হিসেবে স্টাম্প তুলে নেওয়াতেই বোঝা যাচ্ছিল, এই জয় বাংলাদেশের জন্য কতটা ঐতিহাসিক।
এরপর মাঠেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগ দেন দলের সাপোর্ট স্টাফরা। প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কল আসে, অভিনন্দন জানান তিনি। হাসিমুখে দলীয় ছবিও তোলেন ক্রিকেটাররা। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই মাঠের চেয়ারগুলো গুছিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যান তারা। এ জয় ভাগ্যক্রমে পাওয়া কোনো জয় নয়। বরং কয়েক দিন ধরে পরিকল্পনা, ধৈর্য আর দলীয় পারফরম্যান্সে তৈরি করা দুর্দান্ত সাফল্য।
ডারউইনের এই জয়কে শুধু একটি টেস্ট জয় হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় ছবিটা ধরা পড়বে না। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পেস বোলিংয়ে। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে মিরপুরের নিচু ও ঘূর্ণি সহায়ক উইকেট তখন স্পিনারদের জন্য ছিল আদর্শ। ২০২১ সালে একই ভেন্যুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের পেছনেও বড় ভূমিকা ছিল কন্ডিশনের।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ নিজেদের উইকেট ও ক্রিকেটের ধরন বদলাতে শুরু করেছে। পেসারদের জন্য সহায়ক উইকেটে খেলার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। পেসাররাও এসব উইকেটে খেলে ছন্দ ফিরে পেয়েছে। সেই পরিবর্তনের ফল এবার দেখা গেল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।
শুধু ডারউইন টেস্টেই নয়, এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও বাংলাদেশের পেসাররা দাপট দেখিয়েছেন। সেই সিরিজে নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলাম ছিলেন বড় অস্ত্র। চোটের কারণে তারা ডারউইন টেস্টে ছিলেন না। তবু বাংলাদেশকে থামানো যায়নি।
শান্তর চোখেও এটিই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ‘এটাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের টেস্ট ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পাঁচ-ছয় বছর আগে পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইত না। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে আমরা অনেক টেস্ট খেলছি এবং ছেলেরা টেস্ট ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়, বিশ্বমানের হতে চায়।’
এই পরিবর্তনের পেছনে সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভূমিকাও দেখছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো অভিজ্ঞরা তরুণ পেসারদের টেস্ট ক্রিকেটে আরও বেশি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করেছেন বলে জানান তিনি।
তবে ডারউইনে আসার আগে বাংলাদেশের গল্পটা এতটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। সর্বশেষ টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল তারা। তার আগে অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল নিজেদের সমর্থকদের।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেখানে বাড়তি বাউন্স আর গতির সঙ্গে লড়াই করার কথা, সেখানে সেই প্রস্তুতি ম্যাচের পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে আরও চাপে ফেলেছিল। অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিচেল স্টার্কদের সামনে বাংলাদেশ কতটা টিকতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজরা বিশ্বাস হারাননি। ‘প্রস্তুতি ম্যাচ হারার পরও আমাদের বিশ্বাস ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, এত দিন পর এখানে এসেছি, এটা আমাদের জন্য দারুণ একটি সুযোগ। তারা বিশ্বমানের দল। তাদের হারাতে পারলে আমাদের দেশ ও ক্রিকেটের জন্য সেটা দারুণ কিছু হবে। আমরা জানতাম, বিশ্বাস রাখতে হবে। বিশ্বাস না থাকলে এটা করা সম্ভব নয়।’
ডারউইন টেস্টের প্রথম সকালেই বাংলাদেশের সেই বিশ্বাসের প্রমাণ মিলতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পর হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের পেস আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামে মাত্র ১৯৮ রানে। হাসান মাহমুদ একাই নেন ৬ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ম্যাচে তার শিকার ৯টি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত ১৫ বছরে সফরকারী বোলারদের মধ্যে শুধু ভারতের জাসপ্রিত বুমরাহর ম্যাচ পরিসংখ্যান এর চেয়ে ভালো। হাসানের এই সাফল্যের পেছনে ছিল ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতাও। জুনে কেন্টের হয়ে দুই ম্যাচে ১২ উইকেট নেওয়া এই পেসার ডারউইনের পেস-সহায়ক কন্ডিশনে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নেন।
বোলাররা পথ দেখানোর পর ব্যাটাররাও সেই পথেই হাঁটেন। তানজিদ হাসান তামিমের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান। শুধু টপ অর্ডার নয়, বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেষ চার উইকেটে মিরাজের সঙ্গে ১১৮ রান যোগ করে তারা। এই লড়াকু ব্যাটিংই অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রান অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিলেও মিরাজের ঘূর্ণিতে শেষ পর্যন্ত তাদের ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। তানজিদ শুরুতেই ফিরলেও মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম মিলে সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যান অনায়াসে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় নিশ্চিত হয় ৯ উইকেটে। এই জয় বাংলাদেশকে শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সাফল্যই এনে দেয়নি, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও দিয়েছে বড় লাফ।
শান্তর কাছে এখন অবশ্য ডারউইনের জয় অতীত। সামনে ম্যাকে। সেখানে আবারও একই প্রক্রিয়ায় এগোতে চান তিনি। ‘প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সেশন ধরে খেলতে হবে। বোলাররা তাদের কাজ করেছে, ব্যাটাররা অবদান রেখেছে। বিশেষ করে লোয়ার মিডল অর্ডার ও লোয়ার অর্ডার যেভাবে রান যোগ করেছে, ম্যাকেতেও আমাদের এমনটাই দরকার।’
ডারউইনে যে গল্পের শুরু, ম্যাকেতে সেটির পরের অধ্যায়। হাসান-মিরাজ ও শান্তরা কি এবার পুরো সিরিজের গল্পটাকেও রূপকথায় পরিণত করতে পারবে?
আমারসিলেট/হা



