গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের স্থবির হয়ে থাকা চুক্তি নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের বৈঠকে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বৈঠকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, হামাস অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
ইসরাইলি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার ইসরাইলে তিন ঘণ্টার বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরাইলি সেনারা গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না। তারা সেখানে অভিযানও চালিয়ে যাবে।
এর এক দিন আগে রোববার মিসরে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন কুশনার। ওই বৈঠকে হামাস দাবি করে, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে গাজার ইসরাইলি দখলে থাকা প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
সোমবারের বৈঠকটি হয় গাজায় যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ১৫ দফা রোডম্যাপ নেতানিয়াহু এক সপ্তাহ আগে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করার পর।
কুশনারের সঙ্গে বৈঠকেও নেতানিয়াহু তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার বা সেখানে পুনর্গঠন শুরু করা যাবে না। হামাসের অস্ত্র হস্তান্তর তদারকির জন্য একজন মার্কিন জেনারেল নিয়োগের অনুরোধও করেন তিনি।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যে গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিকীকরণমুক্ত করার জন্য দুটি কর্মদল গঠনে সম্মতি হয়েছে। ইসরাইল ও বোর্ড অব পিস দ্রুত এই কাজ শেষ করতে চায়। গাজায় পুনর্গঠন শুরুর আগেই তা সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তাও বৈঠকটিকে দীর্ঘ, বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সামনে এগোনোর একটি পথ নিয়ে একমত হয়েছেন তারা। এখন হামাস সত্যিই চুক্তি মেনে চলতে চায় কি না, তা দেখানোর দায়িত্ব তাদের।
হামাস-ইসরাইলের অবস্থান যেখানে
হামাস জানিয়েছে, তারা ১৫ দফা রোডম্যাপে সম্মত। এতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও রয়েছে। তবে সংগঠনটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ও বোর্ড অব পিসকে ইসরাইলকে চুক্তিতে সম্মত করানোর আহ্বান জানিয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী মিসর, কাতার ও তুরস্কের কর্মকর্তারাও আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, ইসরাইলকে ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু ইসরাইল বলছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র হওয়ার আগে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। এই দুই বিপরীত অবস্থানই দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মূল কারণ।
বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে নেতানিয়াহু আরো বেশি এলাকা দখলে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।
রোববার কুশনার হামাসের রাজনৈতিক প্রধান খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা ও হামাসের এক কর্মকর্তা বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
হামাসের ওই কর্মকর্তা বলেন, সংগঠনটি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৪ দিনের আলোচনাপর্ব শুরু করার জন্য তারা মধ্যস্থতাকারীদের অপেক্ষায় রয়েছে। এই সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণের কথা রয়েছে। তবে এর জন্য সব পক্ষের রোডম্যাপে সম্মতি প্রয়োজন।
হামাসের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, হামাসের নেতা দাবি করেছেন, চুক্তি বাস্তবায়ন শুরুর আগে ইসরাইলকে গাজায় হামলা বন্ধ করতে হবে এবং তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। গাজাকে বিভক্ত করা এই রেখার সুনির্দিষ্ট অবস্থান কখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ইসরাইলি সেনারাও এর বাইরে চলে গেছে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মধ্যে বাড়ছে মতপার্থক্য
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহুর অনিচ্ছায় ট্রাম্প ক্রমেই হতাশ হচ্ছেন। চুক্তি অনুযায়ী নেতানিয়াহু তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন না বলেও ট্রাম্প মনে করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, কুশনারের সঙ্গে ইসরাইল সফরের সময় ট্রাম্প প্রশাসনের চাওয়া বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের তালিকা থাকার কথা ছিল। এর মধ্যে ছিল গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ, সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।
তবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি মিলেছে বলে হারেৎসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এটি সোমবার ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই দিন ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরাইলের গাজায় হামলা চালানো উচিত নয়।
কুশনারের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠকে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্য নিকোলাই ম্লাদেনভও ছিলেন।
তবে বৈঠকের সময়টি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। জনমত জরিপে নেতানিয়াহু চাপের মধ্যে রয়েছেন। গাজা যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলি সীমান্তবর্তী এলাকায় হামাসের আকস্মিক হামলার আগে নেতানিয়াহুর ভূমিকা দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকরে কেন এত অচলাবস্থা
২০২৫ সালের অক্টোবরে মিসরে কুশনার ও আরেক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে হামাস নেতাদের বৈঠক গাজায় যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে আটকে যায়।
এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ ইসরাইলের রোডম্যাপ প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার দায় এখন ইসরাইলের।
বিবৃতিতে বোর্ড অব পিস ও যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পক্ষ যাতে বাধা দিতে না পারে, সে জন্য ‘অবিলম্বে ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জর্ডান, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারীরাও এতে স্বাক্ষর করেছে।
এর আগে মে মাসে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। তিনি হামাসের ওপর ‘সব দিক থেকে চাপ আরো বাড়ানোর’ কথাও বলেছিলেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ১০০-এর বেশি আহত হয়েছেন।



