ছবির মানুষটি সদর উদ্দিন চৌধুরী

ইব্রাহিম চৌধুরী : সিলেটের রাজনৈতিক ঘরানার যে প্রজন্মের মানুষদের আমরা ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যেতে দেখেছি, সেই বয়সের মানুষ এখন আর খুব একটা অবশিষ্ট নেই। সদর ভাই তাঁদেরই একজন—একটি সময়ের জীবন্ত স্মারক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যে বিশাল সিলেট জেলা ছিল, সেই জেলার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়, তার আগে ও পরে—সিলেটের ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের নাম বলতে গেলে এক দীর্ঘ তালিকা হয়ে যায়। আখতার আহমেদ, সদর উদ্দিন চৌধুরী, শাহ আজিজুর রহমান, এনামুল হক চৌধুরী, মুকসুদ ইবনে আজিজ লামা, ওহিদুল ইসলাম তোফা, জিয়াউদ্দিন লালা, নুরুল হোসেন চঞ্চল, রফিকুল হক—আরও কত নাম!

তখনকার সিলেটের রাজনৈতিক মানচিত্রের ওপর যদি তাঁরা দাগ টেনে বলতেন—এই এলাকা আমাদের, এই জনপদ আমাদের—মানুষ হয়তো সেটিই মেনে নিত। এতটাই ছিল তাঁদের প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক।কিন্তু তাঁরা কেউ সেই মানচিত্রে নিজের নামে কোনো কোঠা চাননি।

জীবনের হিসাবটা বরং অন্যরকম। দেশের ভুল রাজনীতি, সময়ের ভুল সিদ্ধান্ত, নিজেদের কিছু সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে সদর ভাইদের কোথায় নিয়ে গেছে, আর দেশ কী পেয়েছে, সেই হিসাব দীর্ঘ। খুব দীর্ঘ। সে হিসাব করতে বসলে ব্যক্তিগত স্মৃতির ভেতর থেকে জাতীয় রাজনীতির এক বিষণ্ন অধ্যায় বেরিয়ে আসে।
আজ সে অধ্যায়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। আজ শুধু সদর ভাইয়ের কাছে বসেছিলাম।

অশীতিপর মানুষটি পরম মমতায় বসালেন। কথা শুরু হলে আর শেষ হয় না। মনে হলো, এত বছরের জীবনটা যেন তাঁর ভেতরে একটি বিশাল গল্পের ঝাঁপি হয়ে জমে আছে। খুললেই বেরিয়ে আসে একেকজন মানুষ, একেকটি ঘটনা, একেকটি সময়। কতজনকে নিয়ে কত গল্প! কত ঘটনার নায়ক, কত ঘটনার অনুঘটক। কত নাম, কত মুখ, কত বিস্মৃত দুপুর-রাত।

সদর ভাই এক বীর প্রজন্মের উজ্জ্বল প্রতিনিধি—যে প্রজন্ম দেশকে স্বপ্ন দেখেছিল, রাজনীতিকে বিশ্বাস করেছিল, আর নিজের জীবনকে সেই বিশ্বাসের কাছে সমর্পণ করেছিল।
মেডিকেলে পড়েছিলেন। চিকিৎসক হওয়ার পথে ছিলেন। কিন্তু রাজনীতি তাঁকে অন্যদিকে নিয়ে গেল। ডাক্তার হওয়া হলো না।

ফ্রান্স, জার্মানি—জীবনের নানা সময়ে নানা পথ তাঁর সামনে খুলেছিল। কোথাও থিতু হননি। দেশ তাঁকে ডেকেছে। রাজনীতি তাঁকে ডেকেছে। তিনি ফিরে এসেছেন, থেকেছেন, লড়েছেন।
দেশ কাউকে প্রতারণা করে না। প্রতারণা করে কখনো কখনো রাজনীতি। সেই প্রতারণার শিকার শুধু সদর উদ্দিন চৌধুরীর মতো একজন নন। আরও অনেকে। অগুনতি মানুষ। একদিন হয়তো সে গল্পও বলতে হবে। আজ আর সে ক্ষত নাড়াতে ইচ্ছে করছে না। আজ বরং সদর ভাইয়ের স্নেহটুকু নিয়েই ফিরতে চাই।

আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক অগ্রজের নয়। বৈবাহিক সূত্রেও তিনি আমার গুরুজন—মাতুতালয়ে বড় হওয়া আমার স্ত্রীর মামা। জীবনের একসময় তাঁর মতো মানুষদের পাশে বসেছি, কথা বলেছি—আজ ভাবলে সেই দুঃসাহসের কথাও একটু অবাক লাগে। তখন বয়স ছিল, সাহস ছিল। শ্রদ্ধার গভীরতা বুঝে ওঠার বয়স সম্ভবত তখনও হয়নি।

এখন বুঝি।মানুষের বয়স বাড়লে তার চারপাশের মানুষ কমে আসে। সন্তানরা বড় হয়ে যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়। যে ঘর একসময় মানুষের কোলাহলে ভরা ছিল, সেখানে একসময় দুপুর দীর্ঘ হয়, বিকেল আরও দীর্ঘ।
সদর ভাই এখন বাড়িতে অনেকটাই একা থাকেন।সন্তানরা যার যার মতো আছে। আর তিনি? স্মৃতি রোমন্থন করেন।কাউকে পেলেই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। যেন পুরোনো দিনের মানুষগুলোকে স্মৃতির ভেতর থেকে একে একে ডেকে আনেন। কেউ এসে বসলে তাঁর একাকিত্ব একটু সরে যায়, ঘরটা একটু ভরে ওঠে।
আজও তাই হলো। সদর ভাই বলে যাচ্ছেন। আমি শুনছি।

মনে হচ্ছিল, আমি কেবলই একজন মানুষের গল্প শুনছি না। একটি সময়ের গল্প শুনছি। এমন এক সময়ের, যে সময়ের মানুষগুলো চলে গেলে অনেক ইতিহাসও হয়তো তাঁদের সঙ্গে নীরবে চলে যাবে।
পাশে সদর ভাইয়ের অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার স্ত্রী। সিলেটের ঐতিহাসিক সেমাই দিয়ে জামাই আদরে ব্যস্ত। এই মমতাও কম ইতিহাস নয়। মানুষ আসলে কতভাবে মানুষকে ধরে রাখে—কেউ গল্প দিয়ে, কেউ খাবার দিয়ে,

কেউ শুধু পাশে বসে।
সদর ভাই আবার শুরু করলেন।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।
আমাকে উঠতে হবে।
কথাটা বলতে কেমন যেন কুণ্ঠা হলো।
শেষ পর্যন্ত ধীরে বললাম—
“সদর ভাই, আমাকে যে উঠতে হবে।”
তিনি থেমে গেলেন।
আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমিও তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সেই দৃষ্টির ভেতর যেন হঠাৎ অনেক কিছু এসে দাঁড়াল—একটি দেশের জন্ম, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, রাজনীতির উত্থান-পতন, কত মানুষের আসা-যাওয়া, কত বন্ধুর হারিয়ে যাওয়া, কত অসমাপ্ত গল্প।
ভাবলাম, আমি চলে যাব। কিন্তু সদর ভাই থাকবেন এই ঘরে। হয়তো কিছুক্ষণ পর আবার চুপচাপ বসে থাকবেন। সামনে কেউ থাকবে না। তখন হয়তো আজকের কথাগুলোও তাঁর পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে মিশে যাবে।
হয়তো আবার কোনোদিন কেউ আসবে। সদর ভাই তখনও গল্পের ঝাঁপি খুলবেন। আবার কাউকে বলবেন—কে কোথায় ছিল, কোন আন্দোলনে কী হয়েছিল, কে কী বলেছিল, কে কীভাবে হারিয়ে গেল।

মানুষ চলে যায়।
সময় চলে যায়।

রাজনীতিও একদিন তার পুরোনো মুখগুলো ভুলে যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান—নিজের ভেতরে বহন করে একটি সময়কে।
সদর উদ্দিন চৌধুরী তেমনই একজন।
উঠতে গিয়ে শেষবার তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি তাকিয়ে আছেন।
আমিও তাকিয়ে আছি।

কী আশ্চর্য—এত কথা বলার পরও শেষ মুহূর্তে বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলাম না।
শুধু মনে হলো, আমি হয়তো একজন অশীতিপর মানুষকে বিদায় জানাচ্ছি না। বিদায় জানাচ্ছি আমার নিজের দেখা একটি সময়কে।

দরজা পেরিয়ে বাইরে এলাম।পেছনে রয়ে গেল সদর ভাই, তাঁর গল্পের ঝাঁপি আর একা একটি ঘর।
আর আমার সঙ্গে রয়ে গেল তাঁর সেই দৃষ্টি।
মানুষ চলে আসে বহুদূর—দৃষ্টিটা থেকে যায়।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:১৮
  • ১১:৫৬
  • ৪:২৩
  • ৬:১৪
  • ৭:২৯
  • ৫:৩৩