ভয়ংকর পুলিশ: পর্ব-৩

লাঠিয়াল আইজিপি থেকে ফেরারি বেনজীর

লাঠিয়াল আইজিপি থেকে ফেরারি বেনজীর

“টুকাইয়া নিয়া আসবো আমরা। বাড়িতে বাড়িতে গিয়া টুকাইয়া নিয়ে আসবো আমরা। মাটির তলে ঢুকলে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসবো আমরা।–” দম্ভে তার পা যেনো মাটিতেই পড়তো না। পুলিশের শীর্ষ অফিসার এই গরমে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তার লাঠির শক্ত খুঁটি ছিলো ঐ গোপালগঞ্জ। পেছনে থেকে বাঁশি বাজিয়ে তাকে ঘুরাতো এক পলাতক ফ্যাসিস্ট এবং তার সাঙ্গপাঙ্গোরা। তাদের কারো পা-ই এখন আর দেশের মাটিতে নেই। এই কুখ্যাত লোকটি কীভাবে পুলিশের পদ থেকে বেহিসাবী টাকা-পয়সার মালিক হলেন তার কাছে রুপকথা ফেল করবে। আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ, ক্ষমতালিপ্সু, হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানার ভিত গাড়তে নিবেদিত সেবাদাস নিয়ে আমাদের আজকের ভয়ংকর পুলিশের ৩য় পর্ব। এই পুলিশ কর্মকর্তা উত্থান হরর মুভির চাইতে আরও ভয়ংকর আর তার অবৈধ টাকার পাহাড়ের যে তথ্য তা আলী বাবা এবং আলাদীনের রুপকথাকে পেছনে ফেলে দিবে! তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী মতকে যে কায়দায় ইতিহাসের এই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা দমন করেছিলেন তা শুনলে হয়তো কারাগারের শিক কেঁপে উঠবে, শ্রোতারা বাকরুদ্ধ হয়ে যাবে! ইতিহাসের কুখ্যাত সেই লোকটি বাংলাদেশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। পাঠকদের জন্য বেনজীরের কুর্কীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ‘আমার সিলেট’- এ তুলে ধরা হলো:

 

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা মতিঝিলের শাপলা চত্বরের এর গণহত্যা এখনো এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে কাঁদায়। এ শোক এখনো ভুলেনি এদেশের মানুষ। শাপলার গণহত্যা পরিচালনার সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ছিলেন বেনজীর।

তিনি র‌্যাবের প্রধান ছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দেশে-বিদেশে মানবাধিকার কর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়ে র‌্যাব। বিরোধী কর্মী, বুদ্ধিজীবি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের গুম, খুন এবং বিচারবর্হিভূত হত্যার অভিযোগ উঠে বাহিনীটির বিরুদ্ধে। প্রতিদিন খবরের পাতা খুললেই দেখা যেতো ক্রসফায়ার, সকালের মানুষটি বিকালে নিখোঁজ। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেনজীরও ছিলেন, যদিও তখন র‌্যাবে দায়িত্ব পালন শেষে আইজিপি পদে ছিলেন তিনি।

বেনজীর পুলিশের ৩০তম আইজিপি। গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া বেনজীর ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপূর্বে তিনি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)—এর মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নানাধরনের দুনীর্তি ও অপকর্মে মেতে ওঠেন। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ভূমিকা রাখেন তিনি। এছাড়া বিরোধী দলের ওপর জুলুম—নির্যাতন এবং দমন-নিপীড়নে নেতৃত্ব দেন এ দুনীর্তিবাজ পুলিশ অফিসার।

বেনজীর আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানের (তিন মেয়ে) নামে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি তাঁদের কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার কথাও উচ্চ আদালতকে জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রথম পর্ব

হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার সহযোগি ছিলেন আইজিপি মামুন

বেনজীর প্রতারণায় ছিলেন সেরা। আইজিপির প্রভাব খাটিয়ে তিনি ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তার ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে। সেখানে ভর্তির জন্য স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। বেনজীরের তা ছিল না।

হাসিনার সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় বাড়িয়ে কথা বলতো। মনে হতো তারাই এই কাজের একমাত্র পাহারাদার। বাস্তবতা ছিলো একদম উল্টাে। এই বেনজীর ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কিনেছেন। গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর। নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েকশ’ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না বলে জানান তারা।

‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ সর্বপ্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ। এর দুই দিনের মাথায় ২ এপ্রিল ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় বেনজীর আহমেদের অনিয়ম—দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য। প্রতিবেদনে উঠে আসে, বেনজীর আহমেদ সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ৪৩ কোটি ৪৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫২ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।

বেনজীরের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিল কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। আর অভিযোগসংশ্লিষ্ট সম্পদের তথ্য চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব, বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষেও চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষেও চেয়ারম্যানসহ সরকারি—বেসরকারি ৪৬টি দপ্তরে চিঠি দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে আসে। প্রায় সব দপ্তর থেকে তার বিরুদ্ধে রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়। এসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা কেও দেখা যায়, স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকা জেলা, ঢাকা মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, গাজীপুর, কক্সবাজার ও খুলনায় বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা ও তাঁদের তিন মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর, তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর ও জাহরা জেরিন বিনতে বেনজীরের মালিকানাধীন জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, রিসোর্ট ও বাংলো রয়েছে। তাঁদের ১১৬টি ব্যাংক হিসাবের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের মধ্যে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া জয়েন্ট স্টক কম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে নিবন্ধিত পূর্ণ ও আংশিক মালিকানাধীন একাধিক কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলোতে তাঁদের কোটি কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিবন্ধিত একাধিক ব্রোকারেজ হাউসে তাঁদের নামে বেশ কয়েকটি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) একাউন্ট এবং সেসব একাউন্টে লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

দ্বিতীয় পর্ব

পুলিশে ‘ব্র্যান্ড গোপালগঞ্জ’-এর খলনায়ক হাবিবুর

ঢাকায় কমিউনিটি ব্যাংকের কর্পোরেট শাখা থেকে বেনজীর আহমেদ, স্ত্রী জীশান মীর্জা ও মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীরের অস্বাভাবিক লেনদেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর (২৩, ২৪ ও ২৯ এপ্রিল) দ্রুত সময়ে সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ (৬ কোটি ৫২ লাখ ৭৮ হাজার ৯৬৮ টাকা) অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৯ এপ্রিল ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে আউটার ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তিন কোটি, ৩০ এপ্রিল তিন কোটি সাত লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। একই দিনে (৩০ এপ্রিল) সাভানা ফার্ম প্রডাক্টস নামের একটি চলতি হিসাব থেকে ১৪ লাখ টাকা উত্তোলন করেন বেনজীর ও তাঁর স্ত্রী—সন্তানরা। অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত রেকর্ড ও তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বেনজীর আহমেদের নামে মোট ৯ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৫ টাকা, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে ২১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৩ টাকা, বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীরের নামে ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৯ হাজার ৬৯৬ টাকা, মেজো মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৮ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত স্থাবর—অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুনীর্তি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া বেনজীর আহমেদের নামে বান্দরবানের সদর উপজেলায় ২৫ একর লিজ (ইজারা) জমি, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের দোশরপাড়া ও বালুচর মৌজার ধলেশ্বরী সমবায় সমিতি লিমিটেডে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে একটি কেও মোট দুটি প্লট (জমির পরিমাণ ১৪ কাঠা) রয়েছে। ঢাকায় উত্তরা আবাসিক এলাকায় জীশান মীর্জার নামে তিন কাঠা জমি এবং ওই জমির ওপর সাততলা বাড়ি, আদাবরে পিসিকালচার হাউজিংয়ে ছয়টি ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা উচ্চ আদালতকে জানিয়েছে দুদক। অবসরের আগে পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবন তাঁর। ১৯৮৮ সালে মাসিক এক হাজার ৪৭০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরিজীবন শেষ করেন ৭৮ হাজার টাকা বেতনে। সব মিলিয়ে তিনি বেতন—ভাতা বাবদ আয় করেন এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা। যেখানে এই পরিমাণ টাকা কথাও না, সেখানে বেনজীর আহমেদ অবৈধভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি অর্জন করেছেন।

পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দুর্নীতি, অনিয়ম, অপকর্ম আর দেশের সম্পদ লুটপাট করাই যেন তাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার। আর তাকে খোদ আশ্রয়—প্রশ্রয় দিয়েছে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার। নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করেছে। কিন্তু পাপ তো আর গোপন থাকে না।

বাংলাদেশের মাটির নীচ থেকে নিরীহ সাধারণ মানুষকে মতের ভিন্নতার জন্য ধরে আনার হুমকি দেয়া বেনজীর এখন দেশে নেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার ঘাড়ে ঝুলছে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ। এখন শুধুই একজন পলাতক আসামী।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২১
  • ১১:৫৪
  • ৪:১৯
  • ৬:০৯
  • ৭:২৪
  • ৫:৩৫