মোঃ ইসমাইল হুসাইন:
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অপার সম্ভাবনা সৌদি আরবে। বিগত বছরের হিসাবে সাড়ে ৭ লাখ বাংলাদেশি দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্সের সিংহভাগ সৌদি আরব থেকেই আসে। কিন্তু চীনের হুয়াংহুর মত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটাই দুঃখ এখন। বলা যায় গলায় আঁটকে যাওয়া কাঁটা। আকাম নবায়ন করতেই ঘামসিক্ত আয়ের টাকা সব ফুরিয়ে যায়।
নির্মাণ শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, পরিবহন কর্মী থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁর সেবাকর্মী, আবার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী— প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। তাঁদের কষ্টার্জিত ঘামে একদিকে সচল থাকছে সৌদি অর্থনীতির চাকা, অন্যদিকে শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি।
জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরব বরাবরই বাংলাদেশের প্রধান গন্তব্য। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বিএমইটির তথ্য এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন বাংলাদেশি কর্মী পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরবে। এক বছরে একক দেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশের জন্য এক উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে নিজ দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পাঠানো রেমিট্যান্সই আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসগুলোর একটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ মার্কিন ডলার। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসেবে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ ডলারে। এই অর্থে শুধু একটি পরিবারের ভাত-কাপড় বা সন্তানের লেখাপড়াই চলে না, গ্রামের কৃষি জমি থেকে শহরের ছোট দোকান পর্যন্ত চাঙা থাকে, সচল হয় স্থানীয় অর্থনীতি।
কিন্তু এই রেমিট্যান্সের পেছনে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। বছরে আকামা নবায়ন করতেই শেষ হয়ে যায় অনেক প্রবাসীর সারা বছরের ইনকাম। সৌদি আরবে বসবাসরত হাজারো প্রবাসীর এখন প্রধান অভিযোগ একটাই- আকামার খরচ। একজন সাধারণ কর্মী সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা আয় করেন, বছর ঘুরতেই তার সবটাই চলে যায় আকামা নবায়ন, মক্তব আমেল ফি, ইন্স্যুরেন্স ও কফিল খরচের পেছনে। অনেক ক্ষেত্রে আকামা বাবদ ৯ হাজার থেকে ১৩ হাজার রিয়াল পর্যন্ত গুনতে হয়। কোম্পানি আকামা না করে দিলে নিজের পকেট থেকে এই টাকা দিতে হয়। এর পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন না পাওয়া, কফিলের সাথে বিরোধ হলেই হুরুব লাগিয়ে দেওয়ার ভয় এবং দালাল চক্রের মাধ্যমে ফ্রি ভিসায় এসে কাজহীন হয়ে পড়ার মতো ভোগান্তি প্রবাসীদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
প্রবাসীদের অবদান প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে।”
প্রবাসীদের যেকোনো সংকটে সরকার ও তার মন্ত্রণালয় পরিবারের মতো পাশে থাকবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রবাসীরা দেশে ফিরবেন রাজার মতো, এটাই তাদের প্রাপ্য সম্মান, বলেন আরিফ।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রিয়াদে বসবাসরত প্রবীণ প্রবাসী মাওলানা নজরুল হক আমার সিলেটকে বলেন, “আমরা দূরে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে দেশেই। দেশের মানুষ যখন আমাদের সুখ-দুঃখের খবর জানতে পারে, তখন মনে হয় আমরা একা নই।”
একই সুরে প্রবাসী বদরুল ইসলাম বলেন, “আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির অংশীদার। দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রবাসী ও দেশের মানুষের মধ্যে যে সেতুবন্ধন তৈরি হয় তা আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করে।”
প্রায় এক দশক ধরে মদিনায় পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাকাম আল খায়ের হোটেল পরিচালনা করছেন সিলেটের কানাইঘাটের কৃতি সন্তান সুহেল আহমদের। তিনি বলেন, “আগের মতোই ব্যবসা চলছে। হোটেল ভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছুর দামই এখন অনেক বেশি। তারপরও দেশের জন্য লড়ে যাচ্ছি। দেশের মানুষ যদি আমাদের এই অবদানকে সম্মানের চোখে দেখে, তাহলেই সব কষ্ট সার্থক হবে।”
প্রবাসীদের মর্যাদা ও সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সোমা ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আটাব (ATAB) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি মোতাহার হোসেন বাবুল বলেন, “প্রবাসীরা দেশের জন্য যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সেই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার বিমানবন্দরে প্রবাসীদের যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন এবং সেখানে তাদের যথাযথ সম্মান, আন্তরিকতা ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা যায় সেটির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”
নতুন করে যারা সৌদি আরবে যেতে আগ্রহী তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে পা বাড়ানো উচিত নয়। বৈধ পথে, চুক্তিপত্র ভালোভাবে বুঝে এবং প্রয়োজনীয় কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলে প্রবাস জীবন হবে নিরাপদ, সম্মানজনক ও সফল।”



