ইব্রাহিম চৌধুরী : সন্ধ্যা নামছে হ্যামট্রামেকে। মিশিগানের এই ছোট্ট শহরটিতে দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। শহরটা যেন নিজের মতো করে সন্ধ্যার চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে। শীত আসি আসি করছে। বাতাসে হালকা হিমের আভাস। গাছের পাতায় ঋতু বদলের সংকেত।
হেলাল উদ্দিন রানা,পার্থ দেবসহ ঘুরে বেড়াই এ রাস্তা থেকে ও রাস্তায়। দেখা হয়ে যায় শফিউল আলম নাদেলের সাথে। নাদেলের সাথে আলাদ্দিন রেস্তোরাঁয় বসে আমি ও রানা আলম ভাইকে স্মরণ করি।শ্রদ্ধেয় শামসুল আলম চৌধুরী। অগ্রজ এ সমাজ চিন্তক নীরবে কাজ করে যেতেন সমাজ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে। তাদের পাশে থেকে শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করেছি সমাজ সংস্কৃতির নানা পাঠ।
অনেকের কথাই মনে পড়ে।কথায় কথা বাড়ে।সময়ের সেই মানুষগুলো।সেইসব দিনগুলো!
শান্ত শহরের প্রশস্ত রাজপথে কোথাও দু-একজন তরুণের আনাগোনা।কোথাও দল বেঁধে দাঁড়িয়ে স্বদেশি যুবকদের গল্পগুজব। কারও কথায় সিলেটের টান, কারও হাসিতে বাংলাদেশের চেনা উচ্ছ্বাস। হাজার মাইল দূরের এই জনপদে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে কখনো কখনো মনে হয়, বাংলাদেশের কোনো মফস্বল শহরের অলিগলিতে হাঁটছি।হাঁটছি যেন সিলেট শহরেই!
হ্যামট্রামেকের সঙ্গে সিলেটের মানুষের এক নিবিড় যোগ আছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বহু মানুষ এখানে ঘর বেঁধেছেন, সংসার পেতেছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন। কেউ এসেছেন বহু বছর আগে, কেউ অপেক্ষাকৃত নতুন। জীবিকার সন্ধানে আসা মানুষগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরটিরই অংশ হয়ে গেছেন। তাঁদের দোকানপাট, পরিচিত মুখ, বাংলা কথাবার্তা—সব মিলিয়ে দূর প্রবাসেও তৈরি হয়েছে এক টুকরো স্বদেশ। এই শহরের মেয়র এখন আমার এলাকার এক অনুজ।
সন্ধ্যা যত গভীর হয়, শহর তত শান্ত হয়ে আসে। ব্যস্ত দিনের শেষে মানুষ ঘরে ফেরে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠে একে একে। আমি হাঁটি, দেখি, ভাবি। প্রবাসের শহরগুলোকে শুধু চোখ দিয়ে দেখলে হয় না, অনুভব করতে হয় মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে, তাদের চলাফেরা দেখে, রাস্তার নীরবতা শুনে।
হ্যামট্রামেকের এই সন্ধ্যায় আমার কাছে শহরটা সিলেটের মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর শেকড়ের টানে বেঁচে থাকা এক প্রবাসী ঠিকানা বলেই মনে হয়।মানুষের স্মৃতি আর ভালোবাসা কখনো কখনো দুই দেশের মাঝখানের হাজার মাইল পথকেও ছোট করে আনে।
আলাদ্দিনে আড্ডা দেয়া দেশী যুব তরুণ। দ্রুত বদল হওয়া আদল। কেউ জড়িয়ে ধরে,চেনা মুখ, চেনা হাত বাড়িয়ে দিয়ে কেউ বলে উঠে – কেমন আছেন?
