আটককৃতদের নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকাকে এতদিন মূলত ভারতীয় গরু-মহিষের চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্য বলা হতো। কিন্তু এবার পশুর সেই পুরনো রুট ব্যবহার করে ভয়াবহ মানব পাচারের প্রমাণ মিলেছে। পাচারকারী চক্রের ভেতরের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে রোববার দুপুরে উপজেলার উজানীনগর এলাকার একটি ভবন থেকে শিশুসহ ১২ জন নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা, তারা অবৈধভাবে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গত ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই রুট ব্যবহার করে যেমন অনেককে ভারতে পাঠানো হয়েছে, তেমনি ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনীতিকদেরও টাকার বিনিময়ে ওপারে পাচার করেছে এই চক্রটি।

গতকাল বেলা ২টার দিকে উপজেলা কম্পাউন্ডের কাছে উজানীনগর এলাকায় চিহ্নিত চোরাকারবারি করিম আহমদ ওরফে ‘ব্যান্ডিজ করিম’-এর তিনতলা বাড়িটি ঘেরাও করে স্থানীয় জনতা। খবর পেয়ে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই বাসার নিচতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ১২ জনকে আটক করে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সীমান্তের ডিবির হাওর এলাকার চিহ্নিত মানব পাচারকারী হানিফ আহমদ এই চক্রের মূল হোতা (ক্যারিয়ার)। সে গতকাল ভোররাতে ওই নাগরিকদের ভারত থেকে ডিবির হাওর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে জৈন্তাপুরে নিয়ে আসে। এরপর চোরাকারবারি ব্যান্ডিজ করিম ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার মো. আব্দুল্লাহর সহযোগিতায় ওই বাসাটিকে ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে তাদের সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর চোরাচালান ও পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত মো. আব্দুল্লাহ মানব পাচারের সাথে নিজের ও করিমের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেছেন, মূলত মাউথআটি গ্রামের ফারহান ও মুন্না নামের দুই ব্যক্তির সাথে পাচারকারী হানিফের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরেই ফারহান ও মুন্নার নেতৃত্বে করিমের বাসা ঘেরাও করা হয়েছিল। আব্দুল্লাহর দাবি, ফারহান ও মুন্নার বিরুদ্ধেও এলাকায় মানব পাচারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাড়ির মালিক ব্যান্ডিজ করিম চিকিৎসার জন্য ভারতের আসামের গৌহাটিতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, ঘটনার সময় ফারহান ও মুন্না সাংবাদিকদের জানান, হানিফের সাথে জৈন্তাপুর বাজারে প্রভাবশালী একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে, যাদের একাধিক বাড়ি ও বিশাল সম্পত্তি রয়েছে। এখন ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে তারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই রুটটি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিককেও এই হানিফ সীমান্ত পার করে দিয়েছে। এছাড়া গত কয়েক মাসে বিএসএফের পুশইন (জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো) সাময়িক বন্ধ থাকায়, গ্রেপ্তার এড়াতে এবং আইনি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে প্রবাস ফেরত সাধারণ শ্রমিকরা এই দালাল চক্রের শরণাপন্ন হয়ে জৈন্তাপুর দিয়ে দেশে ফিরছিল।

জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, ভারত থেকে চোরাই পথে জৈন্তাপুরে আসার পর স্থানীয় জনতা তাদের আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করে। ফেরত আসা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। কাজের সন্ধানে তারা ভারতে গিয়েছিলেন এবং দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন। এই মানব পাচার চক্রের সাথে কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটন করতে পুলিশ গভীর তদন্ত শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *