
বাংলামেইলের ঈদসংখ্যা সংস্কৃতি: বাঙালির উৎসব ও সৃজনধারা শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন সাংবাদিক আহমেদ নূর।
ঈদকে ঘিরে প্রকাশিত বিশেষ সাময়িকী ‘ঈদসংখ্যা’ এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এমন মন্তব্য করেছেন দৈনিক আগামীর সময়-এর আবাসিক সম্পাদক আহমেদ নূর।
রোববার (২৬ মে) বাংলামেইল আয়োজিত ‘ঈদসংখ্যা সংস্কৃতি: বাঙালির উৎসব ও সৃজনধারা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে ঈদের উদযাপন ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিসর ছাড়িয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃত অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে।
আহমেদ নূর বলেন, একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন পোশাক, সেমাই আর পরিবার–পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। বিনোদনের পরিসরও ছিল সীমিত। তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঈদ উদযাপন ধীরে ধীরে সাহিত্যিক রূপ পেতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ঈদসংখ্যার ঐতিহ্য।
তিনি জানান, বাংলা সাময়িকপত্রে প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে ‘নব নূর’ পত্রিকায়। এর সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ এমদাদ আলী। পরে, বিশেষ করে ১৯৪০-এর দশক থেকে ঈদসংখ্যা প্রকাশের ধারা ব্যাপকতা লাভ করে এবং ক্রমে এটি শক্তিশালী সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
সিলেটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আহমেদ নূর বলেন, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত আল ইসলাহ (১৯৩৬)–সহ পূর্বালী, চিত্রালী, রূপালী, সন্ধানীও বিচিত্রার মতো পত্রিকাগুলো ঈদসংখ্যার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করেছে। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা।
তিনি বলেন, একসময় জাতীয় দৈনিকগুলো এ ধারায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও পরে বড় পরিসরে ঈদসংখ্যা প্রকাশ শুরু করে। ফলে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও সাক্ষাৎকারসহ নানা ধরনের লেখার এক সমৃদ্ধ ভান্ডারে পরিণত হয়েছে ঈদসংখ্যা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহমেদ নূর বলেন, ২০১৮ সালে সিলেট মিরর প্রতিষ্ঠার পর তাঁরা প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার একটি ঈদসংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে জাতীয় পর্যায়ের লেখকেরা লিখেছিলেন, সম্মানী দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি ও আর্থিক সংকটের কারণে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ঈদসংখ্যার এই সাংস্কৃতিক ধারা থেমে থাকার নয়। ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক উদযাপনের অংশ।
বাংলামেইল-এর প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত ও সমৃদ্ধ ঈদসংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে এই ধারাকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব শুধু পেশাগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেওয়ার দায়ও তাঁদের বহন করতে হয়। তিনি সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদের প্রতি বাংলামেইল-এর এই ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় বিশেষ আলোচক সৈয়দ মবনু বলেন, ঈদসংখ্যা মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছোটবেলায় তাঁর মা ঈদসংখ্যা সংগ্রহ করে রাখতেন। সেখান থেকেই পরিবারে মননচর্চা ও সাহিত্যচর্চার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঈদসংখ্যা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি এখন আমাদের সংস্কৃতির অংশ। ঈদ উপলক্ষে এই বিশেষ প্রকাশনা উৎসবকে আরও সার্বজনীন করে তোলে।
নাট্যকার বাবুল আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গল্পকার সেলিম আউয়াল, কবি ও প্রকাশক মালেকুল হক, সাংবাদিক ইয়াহইয়া ফজল, নাট্যকার সুফি সুফিয়ান, প্রকাশক সেলিনা চৌধুরী, সাহিত্য সম্পাদক ফায়যুর রাহমান, প্রাবন্ধিক মীনাক্ষী সাহা, কবি ওয়াহিদ রোকন, প্রাবন্ধিক হেলাল হামাম, সাংবাদিক শাকিলা ববি, ক্রীড়া সাংবাদিক রাফিদ চৌধুরী, সাংবাদিক লতিফুর রহমান উজ্জ্বল, অরুপ নাগ, নাওয়াজ মারজান, হুসাইন ফাহিম, সাইয়্যিদ মুজাদ্দিদ, আনারুল ইসলাম ও জেনারুল ইসলাম।
জান্নাতুল নাজনীন আশার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।